আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

খাগড়াছড়ির এক আসন

জোটবদ্ধ হয়ে লড়তে পারে আঞ্চলিক দলগুলো

আবু তাহের, খাগড়াছড়ি

জোটবদ্ধ হয়ে লড়তে পারে আঞ্চলিক দলগুলো

খাগড়াছড়িতে একটিই সংসদীয় আসন, যা ৯ উপজেলা, ৩ পৌরসভা আর ৩৮ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এখানে বইতে শুরু করেছে ভোটের হাওয়া। আওয়ামী দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ আসনে জয় পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি। বসে নেই জামায়াতও।

তবে বিএনপি-জামায়াতের জন্য এই আসনে চ্যালেঞ্জ হতে পারে আঞ্চলিক দলগুলো। দীর্ঘদিন ক্ষমতার স্বাদ না পাওয়া তিন আঞ্চলিক দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে পারে এমন ইঙ্গিত মিলছে। এতে এই আসনে ভোটের সব হিসাব-নিকাশ উল্টে যাবে এমন ধারণা করছেন স্থানীয়রা।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৯৪ জন। বরাবরই এখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কেউ না কেউ নানা রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তবে একবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুবার বিএনপি প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিজয়ী হন। এছাড়া বাকি নির্বাচনে আসনটি দখলে রেখেছিল আওয়ামী লীগ। দলটির পতনের পর পরিবর্তিত বাংলাদেশে স্বপ্ন দেখছে বিভিন্ন দল। তবে এ আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে ব্যবধান গড়ে দেবেন পাহাড়ি ভোটাররাÑএমনটাই অভিমত রাজনীতিবিদদের।

বিএনপি নেতাকর্মীদের মতে, দলের সহ-কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক ও জেলার সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়াই হচ্ছেন প্রার্থী। তিনি দুবার নির্বাচিত হয়েছেন এর আগে। তিন পার্বত্য জেলায় উন্নয়নে ভূমিকা রেখে ব্যাপক প্রশংসিত হন এই নেতা। এছাড়া ধানের শীষ প্রতীক পাওয়ার দৌড়ে আলোচনায় আছেন বিএনপির সদস্য সমীরণ দেওয়ান ও শহীদুল ইসলাম ফরহাদ। ওয়াদুদ ভূঁইয়া নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে তার স্ত্রী জেলা বিএনপির উপদেষ্টা জাকিয়া জিনাত বিথী প্রার্থী হবেন এমন আলোচনাও শোনা যাচ্ছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আফছার আমার দেশকে বলেন, ওয়াদুদ ভূঁইয়াই হচ্ছেন দলের একমাত্র প্রার্থী। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বিএনপি এখন খাগড়াছড়িতে জনপ্রিয় ও সুসংগঠিত। সমীরণ দেওয়ান ও শহীদুল ইসলামকে দলের কেউ প্রার্থী হিসেবে মেনে নেবে না।

সমীরণ দেওয়ান বলেন, দলের দুর্দিনে মাঠে ছিলাম। এখন দল যদি চায় তবে নির্বাচন করব।

শহীদুল ইসলাম ফরহাদ বলেন, দল বিবেচনা করলে এবং মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচন করতে প্রস্তুত।

khakrachori-4

বিএনপিতে যখন মনোনয়নপ্রত্যাশীর ছড়াছড়ি তখন জামায়াত অনেকটাই নির্ভার। কারণ দলটি এই আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে গত ৭ ফেব্রুয়ারি। তিনি হলেন জেলা জামায়াত নেতা, কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী। রাজনীতির পাশাপাশি এ আইনজীবী খাগড়াছড়িতে মেডিকেল সেন্টার, কুমিল্লায় হাসপাতাল, মাটিরাঙ্গায় রেসিডেনসিয়াল স্কুল, জুনাব আলী ফাউন্ডেশন পরিচালনাসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থেকে সাধারণ মানুষের মাঝে আলাদা অবস্থান ও পরিচয় তৈরি করে নিয়েছেন। গত ৬ মাস ধরে জেলার প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে সমাবেশ, আলোচনা সভা করে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানিকছড়ি, রামগড়, গুইমারা, মাটিরাঙ্গা ও পানছড়িতে এ জামায়াত প্রার্থীর আলাদা ভোট ব্যাংক রয়েছে।

এয়াকুব আলী আমার দেশকে বলেন, নেতা নয়, জনগণের সেবক হতে চাই। আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অর্ধেকের বেশি আসন নিয়ে শাসনব্যবস্থা পরির্তনের জন্য জামায়াতে ইসলামী ভোটের মাঠে কাজ করছে। আমি জেলা উপজেলার সবখানে যাচ্ছি। মানুষ পরিবর্তন চায়। ফলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, বিগত ৫৪ বছরের বিভিন্ন দলের শাসন দেখে দেশের মানুষ হতাশ। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে মানুষ পরিবর্তন চায়। খাগড়াছড়ির মানুষ এবার দুর্নীতি-চাঁদাবাজমুক্ত, দেশপ্রেমিক, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী এয়াকুব আলী চৌধুরীকে সমর্থন দেবে বলে আশা করি। গণসংযোগকালে ভোটারদের ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।

বিএনপি জামায়াত যখন ঘর গোছাচ্ছে, ঠিক তখনই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে এখানে নতুন জোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) মিলে এই জোট হতে পারে। দলগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত হানাহানি রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের আগে তাদের মধ্যে আসনভিত্তিক সমঝোতা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তিন দলের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। সমঝোতার অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ি ছেড়ে দেওয়া হবে ইউপিডিএফকে। রাঙামাটি ও বান্দরবান ছেড়ে দেওয়া হবে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে। অন্যদিকে জনসংহতি সমিতিকে (এমএন লারমা) আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ন্যূনতম পাঁচটি উপজেলা ছেড়ে দেওয়া হবে।

এই আসনে ইউপিডিএফ প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন দলের সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা, দলের অন্যতম কেন্দ্রীয় সদস্য উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা ও নতুন কুমার চাকমা। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন দলের সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা ওরফে জলেয়া ও দলের অন্যতম কেন্দ্রীয় সদস্য মিঠন চাকমা। জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন দলটির সভাপতি বিমল কান্তি চাকমা।

ইউপিডিএফ (প্রসীত)-এর খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা আমার দেশকে জানান, তারা বরাবরই নির্বাচনমুখী দল। গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে তার দল অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেবে। পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোকে শর্ত শিথিল করে হলেও দল হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া উচিত।

জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) প্রচার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত জুপিটার চাকমা বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমরা এখনো সেভাবে ভাবছি না। তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি বিবেচনায় একক না দলবদ্ধভাবে নির্বাচন করব তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই আসনের জন্য প্রার্থী বাছাই করেছে ইসলামী আন্দোলনও। নির্বাচনে লড়বেন দলের নেতা মাওলানা কাউছার আজিজী। তিনি আমার দেশকে বলেন, প্রচলিত নিয়মে ভোট বা পিআর পদ্ধতিতে, যেভাবেই হোক— আমাদের সে প্রস্তুতি রয়েছে। একক না জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেব সেটি কেন্দ্র ঠিক করে দেবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি দলীয়ভাবে খাগড়াছড়িতে কাউকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা না দিলেও আলোচনায় আছেন দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক (দক্ষিণ অঞ্চল) ও জেলা পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মনজিলা ঝুমা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন