জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পতনের পর মানিকগঞ্জের রাজনীতিতে প্রাণ ফিরেছে। একসময়ের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলাটিতে ফ্যাসিবাদের সাড়ে ১৫ বছরে বিরোধী দল-মতের ওপর চলেছে দমন-পীড়ন। তবে ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর আগামী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও তৎপরতা বাড়িয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের কার্যালয়গুলোতে নীরবতা থাকলেও এখন খুবই জমজমাট। তবে নতুন দল নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মানিকগঞ্জে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যক্রম করতে দেখা যায়নি।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে টানা ১৬ বছর শাসন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ থাকলেও এখন দলটির কোনো কার্যালয় এখন নেই। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ফ্যাসিবাদীদের রাজনৈতিক কার্যালয়গুলো। জেলার সাবেক তিন আওয়ামী সংসদ সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সবাই আত্মগোপনে। তবে এর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম ও মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এএম নাঈমুর রহমান দুর্জয় এখন কারাগারে। তাদের মিত্র জাতীয় পার্টিও এখন কোণঠাসা।
সূত্র জানায়, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মানিকগঞ্জের চারটি আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগকে সুবিধা দিতে ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে বিএনপির নিরাপদ এই আসনগুলোর দিকে চোখ পড়ে বিগত এটিএম শামসুল হুদা কমিশনের। সারা দেশের মতো বিএনপি অধ্যুষিত মানিকগঞ্জের নির্বাচনি চারটি আসন ভেঙে তিনটি আসন করে বিএনপিকে কোণঠাসা করার ষড়যন্ত্র ছিল বলে মনে করেন বিএনপি নেতারা। এ কারণে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জের আগের সীমানার চারটি আসন নির্ধারণের কথা শোনা যাচ্ছে বেশ জোরেশোরে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে আগের সীমানা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ ৯৮ হাজার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি আসনে রয়েছে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী।

মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর-দৌলতপুর-শিবালয়)
ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা নিয়ে মানিকগঞ্জ-১ আসন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে মানিকগঞ্জ-১ আসনে শুরু হয়েছে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ। ২০১৮ সালে ধানের শীষের প্রার্থী প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আব্দুল হামিদ ডাবলুর মৃত্যুতে এবার প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন খোন্দকার দেলোয়ারের বড় ছেলে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ড. খোন্দকার আকবর হোসেন বাবলু।
এদিকে জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এসএ জিন্নাহ কবীরও পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন মনোনয়নের জন্য। জেলা কৃষক দলের সাবেক আহ্বায়ক ও দৌলতপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক তোজাও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাবেক সহসভাপতি মো. আমিনুল হক, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শফিকুল ইসলাম সফিকও মানিকগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থীর নাম আগেই ঘোষণা করেছেন। মানিকগঞ্জ-১ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর পেশাজীবীদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য ডা. আবু বকর সিদ্দিককে দলের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি প্রচারে নেমেছেন বেশ জোরেশোরেই। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসাইনও মানিকগঞ্জ-১ আসনে দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এসব প্রার্থী সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সুযোগ পেলেই জনসংযোগ ও বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন।
মানিকগঞ্জ-২ (সিংগাইর-হরিরামপুর ও সদরের একাংশ)
সিংগাইর ও হরিরামপুর উপজেলা এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পুটাইল, হাটিপাড়া ও ভাড়ারিয়া নিয়ে মানিকগঞ্জ-২ আসন। ত্রয়োদশ নির্বাচন সামনে রেখে আসনটিতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। আগে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবারো নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন।
এদিকে সিংগাইর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবিদুর রহমান খান রোমান, জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা মো. আব্দুল হামিদ মিয়া, সাবেক ছাত্রনেতা মো. রতন খান আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জের বাকি দুই আসনের মতো এই আসনেও তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ইবনে সিনা ট্রাস্টের ডিজিএম মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান এই আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।
এছাড়া খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাদ্দিস শেখ মো. সালাহ উদ্দিন, হেফাজত ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস), মানিকগঞ্জ জেলা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মুফতি মো. শামসুল আরেফিন খান সাদী ও গণঅধিকার পরিষদের মো. মুসা মিয়াও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রচার শুরু করেছেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির এসএম আব্দুল মান্নান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি থেকে এই আসনে নির্বাচন করেন আফরোজা খানম রিতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নোয়াব আলী। এই নির্বাচনেই কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম ২০০৯ সালে প্রথমবার সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) হন।
মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া)
সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা নিয়ে জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন মানিকগঞ্জ-৩। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই আসনে বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী সরব হয়েছেন। তাদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির দুবারের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক আফরোজা খানম রিতা, জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জামিলুর রশিদ খান, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও দুবারের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মোতালেব হোসেন প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে মানিকগঞ্জ-৩ আসনটি রাজনৈতিকভাবে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ বলে জামায়াতে ইসলামীও আগেই তাদের প্রার্থী মাওলানা মো. দেলওয়ার হোসাইনকে এই আসনের জন্য চূড়ান্ত করেছেন। সে লক্ষ্যে প্রচার শুরু করেছেন জামায়াতে ইসলামীর এই প্রার্থী।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি থেকে দলের নমিনেশন নিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত হারুনার রশিদ খান মুন্নু। চারবারের সংসদ সদস্য মুন্নু সেই নির্বাচনে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের কাছে অল্প ভোটে পরাজিত হন। তবে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় বিএনপির কোনো প্রার্থী ছিল না। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবার এমপি হন জাহিদ মালেক।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে আফরোজা খানম রিতা ও আতাউর রহমান আতা দলের মনোনয়ন কেনেন। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে ধানের শীষ প্রতীকে রিতা নির্বাচনে অংশ নেন। সেই নির্বাচনি প্রচারে গিয়ে সাটুরিয়ায় কালুশাহ মাজারের কাছে তিনি হামলার শিকার হন। পরে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে উচ্চ আদালতে রিট হয় রিতার বিরুদ্ধে। বাতিল করা হয় তার প্রার্থিতা। শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীকে সমর্থন দেয় বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো। রাতের ভোটের সেই নির্বাচনেও জাহিদ মালেক এমপি হন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভোট বর্জন করে বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনা দলগুলো।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কেন্দ্রঘোষিত সব কর্মসূচি জেলা বিএনপির সভাপতি রিতাই মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০০৯ থেকে এই পর্যন্ত মানিকগঞ্জ জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১৭২টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার অনেকগুলোতেই নিজ খরচে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছেন রিতা। আর গণঅভ্যুত্থানের পর জেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখছেন রিতা। জেলার তিনটি আসনেই আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন বিএনপির এই নেত্রী।
মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক জাফর ইকবাল বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন যেন অবাধ, নিরপেক্ষ হয় সেটি নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে অহিংস রাজনীতি চর্চা করে জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং তরুণ ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা, যাতে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।’
মানিকগঞ্জ জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, ‘দীর্ঘদিন মানিকগঞ্জবাসী নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেনি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটদানের একটি সুযোগ এসেছে। আমার বিশ্বাস এবার মানিকগঞ্জে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

