আজানের সময় ইসকনের মন্দিরে উচ্চশব্দে বাজে বাদ্যযন্ত্র

আজানের সময় ইসকনের মন্দিরে উচ্চশব্দে বাজে বাদ্যযন্ত্র

ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দিরে ইসকনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যে। মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পরিবার উচ্ছেদের চেষ্টা, মন্দিরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নারীঘটিত ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই সম্প্রতি এক কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। সম্প্রতি মন্দির চত্বরে বসবাসকারী শিপ্রার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর আমার দেশ অনুসন্ধান শুরু করলে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

বিজ্ঞাপন

কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষ ও ইসকন নেতা অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাসের যৌন হয়রানি ও অসদাচরণের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে শিপ্রা ঘোষ (১৭)। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গা-ঢাকা দেওয়া অপার গোবিন্দ। পুলিশ বলছে, তদন্তে কেউ অপরাধী প্রমাণ হলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

শিপ্রার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মন্দির চত্বর ও যশোর শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। তার সহপাঠী, শিক্ষক, স্বজন এবং স্থানীয় হিন্দুদের অনেকেই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতনের দাবি, ইসকনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনেকটাই ভিত্তিহীন এবং মন্দিরের অধ্যক্ষ ভালো মানুষ।

শিপ্রার মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে আমার দেশ অনুসন্ধানে নামে। আমার দেশ প্রতিবেদক চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দির ও আশপাশের এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বহু মানুষ ইসকন এবং মন্দিরটির অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইসকনের বিরুদ্ধে মুসলিমদের চেয়ে হিন্দুদের অভিযোগ অনেক বেশি। তারা সাম্প্রদায়িক উসকানি, অর্থ ও নারীঘটিত বিষয়াদি, মন্দির গ্রাস করে নেওয়ার অভিযোগ আনেন সাধুদের বিরুদ্ধে।

শিপ্রার অস্বাভাবিক মৃত্যু ও বিক্ষোভ

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে শহরের চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দির চত্বরের একটি জীর্ণ কুটির থেকে শিপ্রা ঘোষের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। শিপ্রা মৃত নিরদ কুমার ঘোষের মেয়ে এবং শহরতলির ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

পরদিন যশোর জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেন স্বজন ও স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, দশমহাবিদ্যা মন্দিরের অধ্যক্ষের অসদাচরণ, যৌন হয়রানি, মারধর ও অপমান-অপদস্থের শিকার হয়ে শিপ্রা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

বিক্ষোভকালে শিপ্রার ভাইসহ স্থানীয় হিন্দুরা মন্দিরের অধ্যক্ষসহ ইসকনপন্থি ‘সাধুদের’ বিরুদ্ধে গুরুতর নানা অভিযোগ তোলেন। তারা বলেন, অভিযুক্তরা সাধু নন, তারা নারী ও অর্থলোভী। মন্দিরে নিয়মিত নারীদের যাতায়াত আছে। সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ হয়। এমনকি তারা বেশ কয়েকজন নারীকে ভাগিয়ে ভারতে নিয়ে গেছেন।

শিপ্রার মৃত্যুর পর ২২ সেপ্টেম্বর ভাতুড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানটির সামনে ও প্রেস ক্লাব যশোরের সামনে বিক্ষোভ করে। তাদের দাবি, শিপ্রা ছিল শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী ছাত্রী। মন্দিরের অধ্যক্ষ তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছেন—এমন অভিযোগ তুলে তারা তার বিচারের দাবি জানায়। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।

শিক্ষক অমলকৃষ্ণ সরকার বলেন, শিপ্রা নিয়মিত ক্লাস করত এবং পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। সহপাঠীদের সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক ছিল। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া অধ্যক্ষ মো. আরিফুজ্জামান, সহকারী প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক শফিকুল ইসলাম, চায়না খাতুন, সাংস্কৃতিক সংগঠক হারুন অর রশিদ প্রমুখ একই সুরে কথা বলেন।

মন্দির চত্বর ও আশপাশের বাসিন্দাদের অনেকের ভাষ্যও প্রায় একই। তাদের মতে, শিপ্রা শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল এবং তার মধ্যে আত্মহত্যাপ্রবণতার কোনো লক্ষণ তারা দেখেননি।

লাশের পাশে উৎসব নিয়ে ক্ষোভ

শিপ্রার লাশ ১৯ সেপ্টেম্বর ময়নাতদন্ত শেষে মন্দির চত্বরের কুটিরে আনা হয়। সেদিন ছিল রাধাষ্টমী। মন্দিরে ইসকনের উদ্যোগে পূজা ও উৎসব চলছিল। কয়েকশ ভক্তের উপস্থিতিতে বাদ্যযন্ত্রসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠানও হয়।

লাশের পাশে এভাবে উৎসব চলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা। একপর্যায়ে তারা মন্দিরের পুরোহিতসহ কর্তাদের দিকে তেড়ে গেলে ভক্তদের অনেকেই উৎসব ফেলে পালিয়ে যান। এই সুযোগে গা-ঢাকা দেন অপার গোবিন্দসহ তার ঘনিষ্ঠ সহচররাও। মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, লাশ রাখা অবস্থায়ও অনুষ্ঠান চলছিল; বরং একপর্যায়ে লাশটিই সরিয়ে নিতে বলা হয়।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতনও ওই দিন মন্দিরে অনুষ্ঠান চলার কথা স্বীকার করেন। তার দাবি, তিনি গিয়ে হস্তক্ষেপ করার পর অনুষ্ঠান বন্ধ হয়।

অবশ্য অপার গোবিন্দ দাসের দাবি, তিনিই অনুষ্ঠান বন্ধ করেছিলেন এবং পরিস্থিতি বুঝে মন্দির থেকে সরে যান। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ নেয়নি পুলিশ

শিপ্রার ভাই পাপন ঘোষের দেওয়া লিখিত অভিযোগে মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস, অর্জুন দাস, পার্থ দাস, পবিত্রসহ অজ্ঞাত আরো সাতজনের বিরুদ্ধে যশোর কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দেন। এতে ঘটনার দিনসহ বিভিন্ন সময় শিপ্রাকে যৌন হয়রানি, অশালীন অঙ্গভঙ্গি ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ ছাড়াও তার মাকে শারীরিকভাবে আক্রমণের অভিযোগ আনা হয়। এসব ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে শিপ্রা আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে থানা পুলিশ ওই অভিযোগ গ্রহণ করেনি।

পাপন ঘোষের দাবি, তাদের দেওয়া অভিযোগ তিন দফা সংশোধনের পর পুলিশ গ্রহণ করে এবং যৌন হয়রানিসহ গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলো বাদ দেওয়া হয়। গৃহীত অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তার বোন ব্যক্তিগত কারণে মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও অসহায় হয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ ইসকনের প্রভাবে পরিবারের দেওয়া ওই অভিযোগ গ্রহণ না করে ‘নিজেদের ইচ্ছামতো অভিযোগ’ লিখে তা লিপিবদ্ধ করেছে বলে অভিযাগ করেন পাপন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি কবির হোসেন দাবি করেন, পুলিশ যে অভিযোগ পেয়েছে, সেটিই নেওয়া হয়েছে।

তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণের কোনো সুযোগ নেই বলে আমার দেশকে জানান যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক। ধর্ষণ বা এমন কোনো এক্সট্রিম ঘটনা ঘটলে তা ময়নাতদন্ত বা ভিসেরা রিপোর্টে আসার সুযোগ আছে বলে তিনি জানান।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ও জেলা পুলিশের মুখপাত্র মিরাজুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ইসকনের প্রভাব থাকলেও আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এই মৃত্যুর ঘটনায় কেউ অপরাধী হিসেবে প্রমাণ হলে তিনি যত ক্ষমতাশালীই হোন, ছাড় দেওয়া হবে না। একই কথা বলেছেন পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলামও।

মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ

যশোর শহরের দক্ষিণাংশের চাঁচড়া এলাকায় অবস্থিত দশমহাবিদ্যা মন্দিরটি জেলার পুরোনো স্থাপনাগুলোর একটি। চাঁচড়ার রাজবংশ এ মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে রাজা শুকদেব রায় ও রাজা শ্যামসুন্দর রায়ের আমলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ রয়েছে।

একসময় এখানে ১৬টি বিগ্রহ ছিল বলে ওই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। চাঁচড়ার রাজবংশের উত্তরসূরিরা দেশ ছাড়ার পর ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে মন্দিরের পূজা-অর্চনা ও দেখভাল চলত। পরে স্থানীয় সনাতনীদের নিয়ে কমিটি গঠন করে মন্দিরটি পরিচালিত হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০১৬ সালে মন্দিরটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনের সম্পৃক্ততা শুরু হয়। কমিটি থাকলেও ক্রমে ইসকনের কথিত সাধুরাই মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেন বলে জানান স্থানীয় সনাতনীরা।

জরাজীর্ণ মন্দিরের পূজা ও দেখভাল অব্যাহত রাখতে স্থানীয় হিন্দুরাই ইসকনকে ডেকেছিল বলে দাবি করেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন। তবে মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পাপন ঘোষ, প্রান্ত ঘোষ ও রিপা রানি ঘোষের অভিযোগ, পূজা পরিষদ ও মন্দির কমিটিকে প্রভাবিত করে ইসকন সেখানে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

প্রবেশাধিকার নিয়ে অভিযোগ

স্থানীয় সনাতনীদের অভিযোগ, ইসকন মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পূজা ও উৎসবের সময় ছাড়া প্রধান ফটক বন্ধ থাকে বলেও তাদের দাবি। এক হিন্দু নারী অভিযোগ করেন, ইসকনের লোকেরা মন্দিরটিতে এমন পরিবেশ তৈরি করেছে, যাতে স্থানীয়রা খুবই অসন্তুষ্ট। তিনি ইসকনের হাত থেকে মন্দিরটি উদ্ধারের দাবি জানান।

আরেক নারী অভিযোগ করেন, ইসকন মন্দিরের অধ্যক্ষ এর আগেও কয়েক নারীর সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে ‘মন্দিরে ঢুকতে দেবেন না’ বলে হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ মন্দিরে নারীঘটিত অনিয়ম ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও করেছেন। কয়েকজন নারীকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করারও অভিযোগ তোলেন কেউ কেউ। তবে অনুসন্ধানে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।

মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মন্দিরে সবার প্রবেশাধিকার রয়েছে।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন বলেন, তিনি যতবার মন্দিরে গেছেন, গেট খোলা পেয়েছেন এবং ইসকনের সাধুরা ভালো মানুষ।

আজানের সময় বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অভিযোগ

মন্দিরের আশপাশের হিন্দু-মুসলমান বাসিন্দাদের কয়েকজনের অভিযোগ, মসজিদে আজানের সময়ও মন্দিরে উচ্চশব্দে খোল-করতাল বাজানো হয়। এতে স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হচ্ছে বলে তাদের দাবি।

মন্দিরের কাছাকাছি বসবাসকারী বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি এখন আর মন্দিরে পূজা দিতে যান না। বিশ্বনাথের অশীতিপর মা দশমহাবিদ্যা মন্দিরের পাশে একটি দোকানে বসে বলেন, ইসকনের লোকেরা খারাপ। তারা এখানে ঝামেলা বাধাতে চায়। এতে আমরা বিপদে পড়ব।

চাঁচড়া বাজার মোড়ের নরসুন্দর শ্যামল দাসের ভাষ্য, আশপাশের মুসলমানদের কয়েকজনও আমাকে ইসকনের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। আমি জানি না, ইসকন আসলে কী চায়।

মন্দির চত্বরে বসবাসকারী অনুপমা ঘোষ বলেন, আশপাশের মুসলমানদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্ক। কিন্তু ইসকনের কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে সে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

তবে অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ এসব অভিযোগও অস্বীকার করেন। অজ্ঞাত স্থান থেকে তিনি আমার দেশকে টেলিফোনে বলেন, সেখানে শুধু মৃদঙ্গ ও করতাল বাজানো হয় এবং এতে মুসলমানদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

চত্বর থেকে বাসিন্দাদের উচ্ছেদের অভিযোগ

মন্দির চত্বরে একসময় প্রায় ১০টি সনাতনী পরিবার বসবাস করত বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের কেউ কেউ কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দিরের জীর্ণ অবস্থার সুযোগ নিয়ে এখানে ইসকনের অনুপ্রবেশ ঘটে। তারা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর চত্বরে থাকা নিম্নবিত্ত এসব পরিবারকে ধীরে ধীরে উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে।

তাদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে পানি ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া, দুর্ব্যবহারসহ নানা উপায়ে তাদের চত্বর ছাড়তে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে লালু শীল, সদা শীল ও শ্যামল সরকারের পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

কাপড়ের দোকানের কর্মচারী পাপন কুমার ঘোষ বলেন, এখানে ১০ ঘরের বসবাস ছিল। ইসকন আসার পর তিন ঘর উচ্ছেদ হয়েছে। বাকিদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন প্রেসিডেন্ট (মন্দিরের অধ্যক্ষ ও ইসকন নেতা অপার গোবিন্দ দাসকে স্থানীয়ভাবে প্রেসিডেন্ট বলা হয়)।

উচ্ছেদ হওয়া শ্যামল সরকার আমার দেশকে বলেন, তার পুত্রবধূ সন্তানসম্ভবা থাকায় বর্ষায় পানি ওঠা ঘর থেকে পরিবার নিয়ে কিছুদিনের জন্য ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। পরে ফিরে এসে দেখেন তার ঘর উচ্ছেদ করে সেখানে রথ স্থাপন করা হয়েছে।

সেখানে অবস্থানরত মৌসুমি ঘোষসহ সনাতনীদের অভিযোগ, আমাদের ধর্মেরই তো গুরু। তাই অনেক কিছু প্রকাশ্যে বলতে পারি না। কিন্তু তাদের (ইসকন নেতাদের) আচরণ মেনেও নেওয়া যায় না।

চত্বরের বাসিন্দারা বলছেন, তাদের তিন পুরুষের বসবাসের জায়গা থেকে উচ্ছেদ করে পুরো মন্দির চত্বর ইসকনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ইসকনের অর্থ ও প্রভাবের মুখে গরিবরা টিকতে পারবেন না জেনে কেউ কেউ বাইরে জমি কেনার চেষ্টা করছেন বলে স্বীকার করেন। তবে তারা মন্দির চত্বরেই থাকতে চান। একান্তই না পারলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানান।

তবে অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দের দাবি, কেউ কেউ স্বেচ্ছায় চলে গেছেন। অন্যরা চলে যেতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে না।

শিপ্রার মায়ের সঙ্গে বিরোধের অভিযোগ

প্রায় এক যুগ আগে মন্দিরের একটি অংশ ধসে পড়ে দুই ভাই নিহত হন। তাদের একজন ছিলেন শিপ্রার বাবা নিরদ কুমার ঘোষ। স্বামীকে হারানোর পর শিপ্রার মা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।

মন্দিরে নিয়মিত পূজা-অর্চনা চলায় প্রসাদের আশায় ওই নারী সেখানে যেতেন। কিন্তু প্রসাদ দেওয়া নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে তার প্রায়ই বিরোধ হতো বলে স্থানীয়দের দাবি। শিপ্রার মৃত্যুর দিনও তার মায়ের সঙ্গে অধ্যক্ষের বিবাদ ও ঢিল ছোড়াছুড়ি হয় বলে স্থানীয়রা জানান। পরে শিপ্রা তার মাকে ঘরে এনে শিকল দিয়ে আটকে রাখে বলেও তারা দাবি করেন।

ইসকনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

মন্দিরের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নারীঘটিত অভিযোগের পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও করেছেন মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত। তার দাবি, ভক্তদের দেওয়া বিপুল অনুদানের যথাযথ হিসাব মেলেনি। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মন্দিরের জন্য পাওয়া ৮০ হাজার টাকার একটি অনুদানের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, অপার গোবিন্দ তার কাছে ‘সুবিধার লোক’ নন এবং অনুদানের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন অপার গোবিন্দ।

কে এই অপার গোবিন্দ

মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস সম্পর্কে স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের বক্তব্য রয়েছে। তার পারিবারিক পরিচয় ও অতীত সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্যও অনেকের জানা নেই।

মন্দির চত্বরে বসবাসকারী কয়েকজনের অভিযোগ, তার আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। কেউ কেউ তাকে আর্থিক ও নারীঘটিত অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মতে, অপার গোবিন্দ ভদ্র ও বিনয়ী এবং ইসকনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও ভালো মানুষ।

অপার গোবিন্দ নিজেও তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অবশ্য পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির মতে, অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ খুবই ভদ্র ও বিনয়ী।

তদন্ত করবে রাইটস যশোর

শিপ্রা ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় ওঠা অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর। নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিকের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু, প্রেস ক্লাব যশোরের সাধারণ সম্পাদক নূর ইসলাম, সহসভাপতি সরোয়ার হোসেন এবং মানবাধিকারকর্মী তাহমিদ আকাশ।

শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, তার পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের অধ্যক্ষের ভূমিকা এবং মন্দির চত্বরে দীর্ঘদিনের বিরোধ—সবকিছুর তদন্তেই এখন নজর স্থানীয়দের।

শিপ্রার পরিবার ও মন্দির চত্বরে বসবাসকারীসহ অন্য সনাতনীরা অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাসকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক মন্দিরটি ইসকনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার দাবিও তুলেছেন তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন