পর্যাপ্ত মজুত সত্ত্বেও বাড়ল খোলা লবণের দাম

এম কে মনির, চট্টগ্রাম

পর্যাপ্ত মজুত সত্ত্বেও বাড়ল খোলা লবণের দাম

ঈদুল আজহা সামনে রেখে চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও প্রতিবস্তা লবণের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে চামড়া সংরক্ষণ ও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা।

তারা জানান, বর্তমানে ৭৪ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা চামড়ার লবণ বিক্রি হচ্ছে ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায়। অথচ গত ঈদুল ফিতরের সময় একই লবণ বিক্রি হয়েছিল ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকায়। তাদের অভিযোগ, লবণের বাজারে কোনো সংকট না থাকলেও মিল মালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এর প্রভাব পড়েছে খুচরা ও পাইকারি বাজারে। ইতোমধ্যে নানা সংকটে জর্জরিত চামড়া আড়তদাররা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন। ফলে ছোট হয়ে আসছে আড়তদার সমিতিও।

এছাড়া বছরের পর বছর ঢাকার চামড়া টেনারিগুলোর দেনা-পাওনার ঘানি টানছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা। তার ওপর লবণের দাম বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা।

চামড়া আড়তদারদের মতে, প্রতিটি গরুর চামড়ায় গড়ে ১০ কেজি লবণ প্রয়োজন হয়। আগে যেখানে একটি চামড়ায় প্রায় ১০০ টাকার লবণ খরচ হতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়। কিন্তু টেনারি মালিকরা সে অনুপাতে চামড়ার দাম বাড়াচ্ছেন না। ফলে ব্যবসায়ীদের লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।

চলতি বছর কেবল ঈদুল আজহার আগের দিন রাতে সাত হাজার বস্তা লবণ প্রয়োজন হবে চট্টগ্রাম ব্যবসায়ীদের। যেখানে প্রতি বস্তায় ৭৪ কেজি করে ৫১৮ টন লবণ থাকবে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা চামড়াসহ চার লাখ চামড়ার বিপরীতে চট্টগ্রামে চার হাজার টন লবণ কিনতে হবে ব্যবসায়ীদের। ফলে এখন থেকেই লবণ কিনে মজুত করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। কিন্তু চড়া দামে অনেকেই পড়েছেন বিপাকে।

তারা জানান, চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে প্রণোদনার লবণ দেওয়া হলেও আড়তদারদের কোনো লবণ দেওয়া হয় না। অথচ মাত্র ১০ শতাংশ চামড়া মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো সংগ্রহ করে থাকে। বাকি ৯০ শতাংশ চামড়া আড়তদাররা সংগ্রহ করে থাকেন। সরকার সারা দেশে কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আড়াই লাখ বস্তা লবণ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। যেখানে চট্টগ্রামেই এ বছর দেওয়া হবে ১৩ হাজার বস্তা বা ১০০৫ টনের বেশি লবণ। চামড়াশিল্পকে বাঁচাতে শুধু একটি ক্ষেত্রে প্রণোদনার লবণ প্রদান করা এক ধরনের বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করেন ব্যবসায়ীরা।

বিসিক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় জানিয়েছে, বর্তমানে জেলায় আট হাজার ৬৭০ টন পরিশোধিত লবণ এবং ৬৪ হাজার টন ক্রুড লবণ মজুত রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামে প্রায় আট লাখ ১৮ হাজার পশু কোরবানি হতে পারে। এসব পশুর চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজন হবে প্রায় পাঁচ হাজার ৩২২ টন লবণ।

বিসিক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক আলমগীর আল-কাদেরী বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে অনেক সময় লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়। তবে বর্তমানে বাজারে লবণের কোনো সংকট নেই। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজার মনিটরিং করা হবে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত গরমে অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। গত বছর পরিবহন সমস্যা, লবণ প্রয়োগে দেরি হওয়া, দাম না পাওয়াসহ নানা কারণে অনেক ব্যবসায়ীর চামড়া নষ্ট হয়। এবার দ্রুত চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা ও বিক্রির প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা। তিনি বলেন, প্রতিটি চামড়ায় ১০ কেজি লবণ দরকার হয়। লবণের দাম বাড়লে আমাদের উৎপাদন খরচও বাড়বে।

সমিতির উপদেষ্টা আব্দুল কাদের বলেন, লবণ মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে হঠাৎ করেই লবণের দাম বেড়ে গেছে। ঢাকায় পৌঁছাতে প্রতিটি চামড়ার জন্য সাড়ে ৪০০ টাকা খরচ করতে হয়। অথচ সরকারের দাম মানেন না টেনারি মালিকরা। এতে আমরা লোকসানে পড়ি। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ২০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা রয়েছে ঢাকার কাছে। চামড়া বিক্রি করলেও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, নানা কারণে ঢাকার টেনারিগুলো বকেয়া টাকা ছাড়ছে না। একইসঙ্গে লবণ ও নগদ টাকায় জনগণের কাছ থেকে চামড়া কিনতে হয়। ফলে এখানে বিশাল বিনিয়োগ করতে হয়। এতে নতুন করে ঋণ গ্রহণ প্রয়োজন হয় অনেক আড়তদারের।

ছোট হয়ে আসছে চামড়াশিল্প

সমিতি সূত্র জানায়, পূর্বে ১১২ জন আড়তদার চামড়া ব্যবসা করলেও বর্তমানে ৩০-৪০ জনে নেমে এসেছে। কয়েক বছর ধরে চামড়াশিল্পে মন্দা থাকায় ব্যবসায়ীরা পেশা পরিবর্তন করেছেন। ফড়িয়ারাও এখন লোকসান গোনেন। আর যারা চামড়া লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে ধরে রেখে বিক্রি করতে চান, তারা আরো বড় ধরনের লোকসানে পড়েন। সরকারিভাবে এ বছর ঢাকায় গরুর চামড়া ৬২-৬৭ টাকা প্রতি বর্গফুট আর ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা প্রতি বর্গফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ছাগলের ক্ষেত্রে সারা দেশের জন্য একই দাম ঠিক করে দিয়েছে সরকার। খাসির চামড়া বর্গফুটপ্রতি ২৫-৩০ টাকা ও ছাগির চামড়া ২২-২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৃষ্টির অজুহাতে দাম বৃদ্ধি

মেসার্স এলিট সল্ট ক্র্যাশিং ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী আজিজুল কাদের বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে চলতি মৌসুমে ৬৯ হাজার একর জমিতে ২৭ লাখ টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে বাজারে লবণের সংকট দেখা দিয়েছে এবং দামও বেড়েছে। কজন লবণ ব্যবসায়ী জানান, পলিথিনের দাম ও বোট ভাড়া আগের চেয়ে বেড়েছে। এতে লবণচাষিদের পুষিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তবে মজুতে কোনো সংকট নেই জানিয়ে বিসিক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক আলমগীর আল-কাদেরী বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে অনেক সময় চাষিরা লোকসানে পড়েন। তাদের পুনরায় মাঠ প্রস্তুত করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় হয়। তাছাড়া চাহিদা বাড়লে দামও বাড়ে। আমরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে বাজার মনিটরিং করব। সরকারি লবণও যথাযথ ব্যবহার হয় কি না দেখভাল করা হবে। তিনি বলেন, এ বছর সরকারিভাবে চট্টগ্রামের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক হাজার পাঁচ টন লবণ বিতরণ করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন