কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে গিয়ে গত এক সপ্তাহে অগ্নিকাণ্ড এবং পানিতে ডুবে অন্তত ১৪ জন পর্যটক নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল মেরিন ড্রাইভের পাশে পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। সেখানে আগুনে নারী ও শিশুসহ ১০ জন পর্যটকের মৃত্যুর পর কক্সবাজার ভ্রমণে নিরাপত্তার বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের পর্যটনে নানা সংকট ও সমস্যা তুলে ধরে সমালোচনা করছেন অনেকে।
রিসোর্টে আগুনের ঘটনার পর কক্সবাজার বেড়াতে যান শিক্ষার্থী শ্রাবণী ইসলাম। জীবনে প্রথম কক্সবাজারে এসেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে; সাগরে সূর্যাস্ত, সৈকত ও মানুষের ভিড় সবই তার কাছে নতুন। তবে এই ভ্রমণে তার মধ্যে ভয়ও কাজ করেছে।
তিনি বলেন, “রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এমন ভয় হয়েছিল। যে হোটেলে উঠেছি, সেখানে নিচে রেস্তোরাঁ থাকতে পারে, আগুন লাগে কি না—এমন ভয়ও কাজ করেছে। বাসা থেকে বলে দিয়েছে পানিতে নামা যাবে না এবং দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন কোনো রাইডে ওঠা যাবে না।”
সপরিবারে বেড়াতে আসা আইরিন আক্তার ও হাবিবুর রহমান দম্পতি জানান, কক্সবাজার ভ্রমণ তাদের পছন্দ এবং প্রতিবছর একাধিকবার তারা সাগরসৈকতে আসেন। নিয়মিত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে এই দম্পতি মনে করেন, যাতায়াতব্যবস্থা থেকে শুরু করে আবাসন, খাদ্য ও সৈকতের রাইড—সবক্ষেত্রেই সেবার ঘাটতি, নিরাপত্তা ও মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে।
টুপটুপ রিসোর্টে দুর্ঘটনার দিন তারা ইনানিতেই ছিলেন বলে জানান আইরিন আক্তার। তিনি বলেন, “কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল বলেই আজ এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা এমনটা প্রত্যাশা করি না। আমরা নিরাপদ থাকতে চাই।”
হাবিবুর রহমান বলেন, এই দুর্ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে মেরিন ড্রাইভে ফায়ার সার্ভিসের একটি স্টেশন থাকা কতটা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, “ডলফিন মোড় থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত কোনো ফায়ার স্টেশন নেই। যদি একটি স্টেশন থাকত, তবে হয়তো দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কম হতো।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, মেরিন ড্রাইভে বেড়াতে আসা অনেকেই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সেই টুপটুপ রিসোর্টের সামনে এসে থামছেন এবং ক্ষয়ক্ষতি দেখে সবাই মর্মাহত। সেখানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের মতে, রিসোর্টগুলো যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে, তা প্রথম দেখাতেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
পাটুয়ারটেক এলাকায় বেড়াতে আসা এক পর্যটক বলেন, “আমার কাছে মনে হচ্ছে, এখানে একটা আর ওখানে একটা রিসোর্ট যত্রতত্র গড়ে উঠছে। সরকারের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী যদি প্রতিটি রিসোর্ট থাকত, তবে ভালো হতো। একটি সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল।”
অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্ট
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ ধরে এগোলে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে বহু রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট। নতুন নতুন আরও রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে। কক্সবাজারে মোট কতটি হোটেল-রিসোর্ট আছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান প্রশাসনের কাছে নেই। তবে ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা পাঁচ-ছয় শ ছাড়িয়ে যাবে।
এসব হোটেল-রিসোর্টের অধিকাংশই চলছে যথাযথ অনুমোদন ও ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, মেরিন ড্রাইভের আশপাশে ৪০ থেকে ৫০টি রিসোর্ট অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে। তবে তাঁদের সংগঠনের নিবন্ধিত হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা আড়াই শর মতো।
এদিকে টুপটুপ রিসোর্টেরও কোনো অনুমোদন ছিল না এবং রিসোর্টটি অপসারণের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)।
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, “টুপটুপ রিসোর্টটিতে ২০২৩ সাল থেকে তিন দফায় নোটিশ দিয়েছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। রিসোর্টটি অপসারণ করার নির্দেশনা দিয়ে কর্তৃপক্ষ থেকে চূড়ান্ত নোটিশও দেওয়া হয়েছিল।”
যেকোনো স্থাপনা নির্মাণে কউকের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টই তা ছাড়াই গড়ে উঠেছে বলে জানান জসিম উদ্দিন। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযানের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টের ফায়ার লাইসেন্স নেই। আনুমানিক ছয় শতাধিক হোটেল-রিসোর্টের মধ্যে মাত্র দেড় শর মতো প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে।
কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্ট এলাকায় দায়িত্বরত ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) শফিকুল ইসলাম জানান, বিগত সময়ে ১২৫টি নবায়নসহ ম্যানুয়াল লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ই-লাইসেন্সের আবেদন জমা পড়েছে ৫৩টি, যার মধ্যে ২৩টি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় ছয় শতাধিক হোটেল-রিসোর্টের মধ্যে পাঁচ শর মতো প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার সার্ভিস থেকে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
“আমরা তাদের ফায়ার লাইসেন্সের আওতায় আসার তাগিদ দিই। যিনি ব্যবসা করবেন, তাকে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আগুন লাগতেই পারে, কিন্তু মানুষের জীবন যেন বিপন্ন না হয় এবং কেউ যেন মারা না যায়—সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। মানুষ নানাভাবে ব্যবসা করবে, কিন্তু জানমালের যেন কোনো ক্ষতি না হয়,” যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নোটিশ পাঠানো একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। “নোটশ দেওয়ার পর তো আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারি না, কারণ আমাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট নেই কিংবা সিলগালা করারও সুযোগ নেই। আমরা কেবল সচেতন করতে পারি ও সতর্ক করে আসতে পারি।”
“অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান অনেক রয়েছে। যাঁরা ব্যবসা করছেন, তাদের নিজেদেরই নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। ফায়ার সেফটি থাকলেই যে আগুন লাগবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে আগুন লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা যেন থাকে। টুপটুপে যদি শুরুতেই কেউ গিয়ে রুমে রুমে সবাইকে বের করে নিয়ে আসত, তবে হয়তো অনেক জীবন বেঁচে যেত।”
ব্যবসায়ীরা কী বলছেন
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বাঁশ ও কাঠের তৈরি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এগুলো অতি দাহ্য হওয়ায় আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের রিসোর্টগুলো এক তলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই ভালো হয় বলে মনে করে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্ট লাইসেন্সের বাইরে এবং বৈধ অনুমোদন ছাড়াই অনেকেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এ ছাড়া বহুতল হোটেল-মোটেলগুলোতেও জরুরি নির্গমন পথ বা ইমার্জেন্সি এক্সিট না থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সাগরসৈকত থেকে পৌর এলাকায় ৩০০ মিটার এবং এর বাইরে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই।
মেরিন ড্রাইভে অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁর দেখভাল করেন মো. শফিউল্লাহ। তিনি বলেন, “কক্সবাজারের মাস্টারপ্ল্যান মানলে তো কোনো স্থাপনাই থাকতে পারে না। এখানে বিভিন্ন বাহিনী, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে।”
তিনি আরও বলেন, “সবার জন্য নিয়ম ও আইন এক হওয়া দরকার। সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়ম আমি মেনে নেব, আমরা আইন মেনেই ব্যবসা করতে চাই। এখানে যেন কোনো বৈষম্য না হয়।”
কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান স্বীকার করেন যে নিয়মনীতি ছাড়াই হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠছে এবং এর ফলে বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এটি বিনোদনের জায়গা। এখানে এসে কেউ যদি দুর্ঘটনার শিকার হয়, তবে মানুষ বিনোদনমুখী না হয়ে বিমুখ হয়ে পড়বে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আন্তর্জাতিকভাবেও আমরা দুর্নামের শিকার হব। আমরা মনে করি, ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও সরকারকে একসঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই পর্যটন খাতকে রক্ষা করতে যা যা করা দরকার, তা করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যত্রতত্র অনেক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এটি প্রশাসনের তদারকির অভাব, আমাদের ব্যবসায়ীদের গাফিলতি এবং অতি মুনাফার লোভে কিছু মানুষের তৈরি করা পরিস্থিতির ফল।”
প্রশাসন কী করছে
কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্টের নিরাপত্তার পাশাপাশি বিভিন্ন রাইডে পর্যটকদের হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যত্রতত্র নিয়ন্ত্রণহীন এসব বিনোদনব্যবস্থা নিয়েও পর্যটকদের মনে নানা ঝুঁকি ও অসন্তোষ রয়েছে।
অনেকের অভিযোগ, রাইডগুলো যার যার মতো করে পরিচালনা করা হয়। সৈকতে বিচ বাইক, ঘোড়া ও জেট স্কির মতো বিনোদনব্যবস্থাগুলোর নির্দিষ্ট কোনো দরদাম বা পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট স্পট নির্ধারিত নেই।
কক্সবাজারের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, “কক্সবাজারে যত হোটেল, মোটেল বা রিসোর্ট আছে, সেগুলোর সংখ্যা পাঁচ-ছয় শ হতে পারে। পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে পর্যটকদের সেবা যেন মানসম্মত হয় এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে পূজার পরে আমরা মালিকদের সঙ্গে আবারও বসব।”
তিনি আরও বলেন, “প্রশাসনের উদ্যোগে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আমরা অভিযান পরিচালনা করি। অনেক সময় দেখা যায়, পর্যটকদের চাহিদার কারণে রাতারাতি কাঠের তৈরি স্থাপনা গড়ে ওঠে। আমরা মাঝেমধ্যে এগুলো ভেঙে দিলেও আবার সেগুলো তৈরি করা হয়।”
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের স্থানীয় স্টেশনকে ২২ কিলোমিটার দূর থেকে এসে আগুন নেভাতে হয়েছে। ততক্ষণে পুরো রিসোর্টটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসও মনে করে, মেরিন ড্রাইভে অবিলম্বে একটি ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা প্রয়োজন।
পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন দুর্ঘটনা বাড়ার কারণে মেরিন ড্রাইভে নতুন একটি ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
“এখানে একটি ফায়ার স্টেশন অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু সমুদ্র উপকূলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, ভূমিধস বা নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে, তাই ফায়ার স্টেশন কাছে থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যেত। ২২ কিলোমিটার দূর থেকে এসে আমাদের আগুন নেভাতে হয়েছে। এটি যেমন আমরা চাই, তেমনি এলাকার মানুষও চায়,” বলেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

