গরুর খামার করে সফল তরুণ উদ্যোক্তা ইয়াসিন আরাফাত

গরুর খামার করে সফল তরুণ উদ্যোক্তা ইয়াসিন আরাফাত
কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার ইয়াসিন আরাফাতের গরুর খামার। ছবি: আমার দেশ

গরুর খামার করে সফল হয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার ইয়াসিন আরাফাত। শুধু নিজেই সফল হননি, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন শত শত মানুষের। একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরের ভৈরব বাজার রমজান মিয়ার হাউলি এলাকার ফজলুর রহমানের ছেলে ইয়াসিন আরাফাত । পড়াশোনা করেছেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংএ। সংগত কারণেই তার কাজ করার কথা ফাইবার, সুতা, কাপড় এবং পোশাক তৈরির প্রযুক্তির নানা বিষয় নিয়ে। কিন্তু তিনি কাজ করছেন গরু, দুধ, ঘাস, গোবর, বায়ুগ্যাস, দই, ঘি ইত্যাদি নিয়ে। আর এই ভিন্ন পেশায় গিয়েও সফলতা পেয়েছে দারুণভাবে। তিনি ভৈরবের তরুণ উদ্যোক্তা ও সফল খামারি ইয়াসিন আরাফাত।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, তিনি জাতীয় বস্ত্রপ্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে চাকরির পিছনে না ছুটে ২০১৮ সালে মাত্র চারটি গাভি নিয়ে পাশের উপজেলা কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামে গড়ে তুলেন ‘বস এগ্রো ফার্ম’ নামের একটি ডেইরি খামার। সেই ছোট্ট ফার্মটি এখন দেড়শরও বেশি গরু নিয়ে বিশাল এক ফার্মে পরিণত হয়েছে। যার প্রায় ৭০ শতাংশই তার ফার্মে উৎপন্ন। এরমধ্যে ৩০-৩৫টি দুগ্ধ গাভি আছে। যা থেকে প্রতি দিন ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। প্রথমে এই দুধগুলো বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি করলেও, বর্তমানে তিনি ভৈরবের জগন্নাথপুর এলাকায় গড়ে তুলেছেন দই ও ঘি তৈরির কারখানা। বিএসটিআইসহ সব রকমের সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে সেই দই ও ঘি বাজারজাত করছেন ভৈরবের আশপাশের জেলা-উপজেলাসহ প্রায় সারা দেশে। এখানেও তিনি পেয়েছেন সফলতা। ব্যাপক সাড়া ফেলেছে তার উৎপাদিত ‘বস’ দই ও ঘি।

অন্যদিকে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় তিনি শতাধিক পশুকে মোটাতাজাকরণ করেন। দেশীয় প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানোর মাধ্যমে পশুগুলো লালিত পালিত হয় বলে তার খামার থেকে পছন্দের পশুটি কিনে নিয়ে যান আশপাশের ক্রেতারা। এতেও তার বেশ একটা লভ্যাংশ থাকে বলে জানান তিনি। এছাড়াও তিনি তার খামারের দেড় একরের একটি পুকুরে মিশ্র মাছের চাষ, হাঁস এবং আঙিনায় দেশীয় মুরগি লালনপালন করছেন। খামারের চারপাশে রোপণ করেছেন কলা, মরিচ, লেবু, আম, জামসহ নানান ফলের গাছ। এসব থেকে আহরিত ফলফলাদি পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন হচ্ছে। অন্যদিকে খামারে উৎপন্ন গরুর গোবর দিয়ে তিনি একটি বায়ুগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করেছেন। বর্তমানে চারটি চুলায় তাদের পারিবারিক রান্নার কাজ শেষ করে অব্যবহৃত অতিরিক্ত গ্যাস ছেড়ে দিতে হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে তিনি এই প্ল্যান্টটি আরো সম্প্রসারিত করে গ্যাস দ্বারা চালিত জেনারেটর তৈরি করবেন। যাতে তাদের বিদ্যুতের সমস্ত চাহিদা পূরণ হয়ে যায় বলে জানালেন তিনি।

এদিকে তার এই খামার এবং কারখানায় দক্ষ-অদক্ষ প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা খামারের যত্ন-পরিচর্যা ছাড়াও দই, ঘি তৈরি ও প্যাকেজিং কাজ করে থাকেন।

এই তরুণ সফল খামারি ও শিল্প উদ্যোক্তা ইয়াসিন আরাফাত জানান, সফলতার জন্য শুধু অভিজ্ঞতা নয়-দক্ষও হতে হবে। যে যে কাজে দক্ষতা অর্জন করবে, সে সেক্ষেত্রে ভালো করবে। তিনি খামারকে একটি সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এখানে কেউ আসতে চাইলে এই সেক্টরকে ভালোবাসতে হবে। আবেগ দিয়ে, মায়া দিয়ে কাজ করতে হবে। যারা এই সেক্টরে আসতে চায়, তারা যেন এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে আসেন। অন্যথায় না আসাই ভালো বলে তার অভিমত। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হিসেবে তিনি এই খামারটিকে আরো বড় পরিসরে গড়ে তুলে গ্রাহকদের আরো মানসম্মত পণ্য সরবরাহের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে জানালেন।

ইয়াসিন আরাফাতকে অত্যন্ত সফল খামারি ও শিল্পোদ্যোক্তা আখ্যা দিয়ে ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহীনুল হক জানান, একজন উচ্চশিক্ষিত লোক হয়েও তিনি খামার দিয়ে যে সফলতা দেখিয়েছেন, তা খুবই ভালো। এমন শিক্ষিত উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে দেশের জন্য খুব ভালো হবে। নতুন কোনো উদ্যোক্তা এই খাতে এগিয়ে আসলে তিনি এবং তার দপ্তর সব রকমের সহযোগিতা করবেন।

এদিকে ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মনোয়ারা পারভীন বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য গোস্ত, দুধ, ডিম, দই, মাছ এবং নানা ফলফলাদি খুবই দরকারি এবং উপকারি। সেসবের উৎপাদন এবং সরবরাহ করে এই উদ্যোক্তা দেশ ও জাতির জন্য বেশ উপকার করছেন। এছাড়াও জাতীয় অর্থনীতি রেখে চলেছেন প্রশংসনীয় ভূমিকা। একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও তিনি ভিন্ন পেশা ধারণ করে সফলতা পেয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন