বাগেরহাটের রামপালে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ‘দুবাই বাংলাদেশ সিমেন্ট কোম্পানি’র ডিপোর ভেতরে অবৈধভাবে শতাধিক হরিণ পালনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, রাতের আঁধারে এসব হরিণ জবাই করে বিভিন্ন স্থানে মাংস সরবরাহ করা হয় বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর পাশাপাশি, ডিপো নির্মাণ করতে গিয়ে সরকারি রেকর্ডভুক্ত ‘ঠালনতলা খাল’ ভরাট ও দখলের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওই কোম্পানির ডিপোর ভেতরে অভিনব কায়দায় হরিণ পালন করা হচ্ছে। রাতের বেলায় ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ডিপো থেকে হরিণ বের করে মোংলার একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে জবাই করা হয় এবং সেই মাংস চড়া দামে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গণমাধ্যমকর্মীরা ডিপো এলাকায় গেলে প্রবেশপথেই তাদের বাধা দেওয়া হয়। এ সময় গেটে দায়িত্বরত নিরাপত্তা প্রহরী দাবি করেন, ভেতরে কোনো হরিণ পালন করা হয় না এবং ডিপোর ভেতরে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।
পরবর্তীকালে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে এলে রামপাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চক্রবর্তী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি ডিপোর ভেতরে হরিণ পালনের সত্যতা পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি সরকারি খালের ওপর কোনো স্থাপনা নির্মাণ বা ভরাট করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডিপো-সংলগ্ন সরকারি রেকর্ডভুক্ত ঠালনতলা খালটি একসময় এলাকার পানির প্রবাহ ও কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু কোম্পানির পক্ষ থেকে খালটি ভরাট করে ডিপো নির্মাণ করা হয়েছে এবং খালের ওপর পাকা গেট তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের জমিতে যাতায়াত ও বোরো ধান আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় জামায়াত যুব বিভাগের নেতা মোহাম্মদ খলিলুল্লাহ বলেন, ‘কোম্পানির ভেতরে শতাধিক হরিণ অবৈধভাবে লালন-পালন করা হচ্ছে। আমরা অবিলম্বে এই বন্যপ্রাণীগুলো উদ্ধার করে নিরাপদ আবাসস্থলে অবমুক্ত করার এবং সরকারি খালটি দখলমুক্ত করে কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
এলাকাবাসী মো. রাজু শেখ ও প্রীতিস অভিযোগ করেন, খাল ভরাটের কারণে এলাকার কৃষি অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় মাছচাষি মনি বলেন, ‘হরিণ পালনের যদি কোনো বৈধ সরকারি অনুমতি থাকে, তাহলে তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে হতে হবে। আর যদি অনুমতি না থাকে, তাহলে বন্যপ্রাণী নিধন ও অবৈধ পালন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।’
এ বিষয়ে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে হরিণ চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং রামপাল উপজেলা এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হরিণ জবাই বা এর মাংস বিক্রির কোনো আইনি সুযোগ নেই। এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য দুবাই বাংলাদেশ সিমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
হরিণ পালনের বৈধতা, বন্যপ্রাণী জবাই ও মাংস পাচারের অভিযোগ এবং সরকারি খাল দখলের সত্যতা উদ্ঘাটনে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও এলাকাবাসী।
—এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

