সুনামগঞ্জের শাল্লায় এ বছর হাওরে অন্তত ১৫০ কোটি টাকার ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সঙ্গে ভেসে গেছে অন্তত ২০০ কোটি টাকার খড় (গোখাদ্য)। জলাবদ্ধতার পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বোরো ধান পানিতে ডুবে কৃষকদের এ ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, শাল্লায় এ বছর ২১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমি আবাদ করা হয়েছিল। সেখান থেকে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৪৩ হাজার ৩৬৮ টন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫১৬ কোটি টাকা। কৃষি অফিসের মতে, হাওরে জলাবদ্ধতায় প্রায় ৬৬ কোটি টাকার ২০ হাজার ১৭২ টন ধানের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেখানো হয়েছে ১৪ দশমিক ০৯ শতাংশ ধান। হাওর নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও স্থানীয় কৃষকরা আমার দেশকে জানান, এ বছর হাওরে অন্তত ১৫০ কোটি টাকার ধান ও ২০০ কোটি টাকার গোখাদ্য (খড়) পানিতে ভেসে গেছে।
স্থানীয় কৃষক ও হাওর সংগঠনের একাধিক নেতা জানান, সরকারিভাবে কৃষি অফিস শুধু তলিয়ে যাওয়া ধানের ক্ষতির বিষয়টি খাতায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিন্তু অনেক কৃষকের ধান কাটার পরও রোদ না থাকায় চারা গজিয়েছে। সেসব ধান পচে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ওই ধান পরে পানিতে ফেলে দিতে হয়েছে। নষ্ট ধানের হিসাব সরকারি দপ্তরে নেই। তাছাড়া হাওরের কৃষকদের গৃহপালিত পশুর একমাত্র খাদ্য খড়কুটাও পানিতে ভেসে গেছে। ফলে বাস্তবে ধানের ক্ষতির পরিমাণ ৪১ হাজার ৬৬৬ টনে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে এর বাজারমূল্য ১৫০ কোটি টাকা।
এদিকে সারা বছরের খোরাক (খাদ্য) সোনালি ফসল তলিয়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাওরের অধিকাংশ কৃষক। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, সংসারের বাজার-সদাইয়ের খরচসহ যাবতীয় খরচ চালানো হয় এ ফসল থেকে। কিন্তু এখন আনন্দের বদলে কৃষকদের ঘরে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এদিকে, বর্তমান সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের লাগাতার তিন মাস সহায়তায় ঘোষণা দিলেও এখনো সে সহায়তা কৃষকদের হাতে পৌঁছায়নি। ফলে হতাশার মধ্যেই দিনরাত পার করছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।
জানা গেছে, শাল্লা উপজেলায় মোট কৃষক ২৬ হাজার ৭৯৯ জন। এরমধ্যে ২০ হাজার ২৫০ জনের নাম ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় তোলা হয়েছে। ওই তালিকা নিয়েও বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কৃষকরা। ইতোমধ্যে বেশকিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে জেলা থেকে ওই তালিকা পুনরায় সংশোধনের পর আবার সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন শাল্লা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন বলেন, জলাবদ্ধতায় কৃষকের যে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে—এটা স্বাভাবিক। এ ক্ষতি ছাড়াও কৃষকদের আরো বড় একটি ক্ষতি হলো গোখাদ্য। হাওরের কৃষকদের শতভাগ গোখাদ্য তলিয়ে গেছে। কৃষকদের সহায়তার পাশাপাশি গোখাদ্য ও গৃহপালিত পশুদের নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের শাল্লা উপজেলা শাখার সদস্য সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, কৃষি অধিদপ্তর কৃষকের সঠিক ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করতে পারেনি। এ বছর হাওরে ধানের ক্ষতি ১৫০ কোটি টাকা পার হবে বলে জানান তিনি।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফএম বাবরা হ্যামলিন জানান, গোখাদ্যের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করবে কৃষি অফিস। অন্যদিকে কৃষি অধিদপ্তর বলছে, গোখাদ্যের বিষয়টি দেখবে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গোখাদ্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। আরো পরে করা হবে।
কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় বলেন, পানিতে নিমজ্জিত হয়ে কৃষকদের ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা শুধু পানিতে নিমজ্জিত ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের হিসাব করেছি। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনা দিয়েও কৃষকদের পুনর্বাসনের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বরিশালে ফরচুন সুজে চার মাস ধরে বেতন বন্ধ, মেলেনি ঈদ বোনাস