ধান বাঁচাতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাঠে কৃষক

ভারী বর্ষণ ও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ভারী বর্ষণ ও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী বর্ষণ ও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্রমাগত বর্ষণে তলিয়ে গেছে বোরো ধান। কালবৈশাখীতে উপড়ে পড়েছে শত শত গাছ, ধসে পড়েছে বহু ঘরবাড়ি। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকা। সড়কে গাছ পড়ে কয়েক জায়গায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রোববার ক্ষয়ক্ষতির এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

কালবৈশাখী ঝড়ে ভোলা সদর উপজেলা প্রশাসনের রাস্তা ও প্রশাসন ক্যাম্পাসে বেশ কয়েকটি গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে অন্ধকারে রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। গত শনিবার বিকালে বর্ষণ ও কালবৈশাখী ঝড়ে এ ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান জানান, কালবৈশাখী ঝড়ে আমাদের সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ক্ষতি হয়েছে কয়েক লাখ টাকার। সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ স্বাভাবিক হতে দু-তিনদিন সময় লাগবে।

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলায় কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনটি ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং দুটি ইউনিয়নে আংশিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। শনিবার ও রোববার দুপুরে হঠাৎ শুরু হওয়া ঘূর্ণিঝড়ে শিয়ালকাঁটি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। সেখানে বিদ্যুতের অন্তত পাঁচটি খুঁটি ভেঙে পড়েছে এবং অনেক জায়গায় তার ছিঁড়ে গেছে। এছাড়া চিড়াপাড়া পারসাতুরিয়া ও সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ।

কাউখালী পল্লী বিদ্যুতের ইনচার্জ কামাল হোসেন বলেন, ঝড়ে কাউখালীতে বিদ্যুতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সিংড়ায় সোনার ফসল হুমকিতে

নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অঞ্চলে বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে হানা দিয়েছে আগাম বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়া। কদিনের টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে আসা ঢলে আত্রাই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চলনবিলের শত শত কৃষকের ‘সোনার ফসল’ হুমকির সম্মুখীন। এ বছর সিংড়ায় প্রায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ জানান, তিনি নিজেই বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম আনু বলেন, আগাম বন্যার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।

লাখাইয়ে পানির নিচে বোরোর জমি

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় কালবৈশাখী ও টানা ছয়দিনের বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, গাছপালা এবং রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ অনেক স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি, তারের ওপর গাছ ও গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে । পাশাপাশি শত শত একর বোরো ধানের ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহেদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, লাখাইয়ে বোরো আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ২০৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, নিমজ্জিত রয়েছে ৩৯৫ হেক্টর জমি, আংশিক নিমজ্জিত রয়েছে ৬৮০ হেক্টর। তবে কৃষকরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি।

বিয়ানীবাজারে তলিয়ে গেছে বোরো ধান

টানা কদিনের ভারী বৃষ্টিতে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার অধিকাংশ বোরো ধান তলিয়ে গেছে। চোখের সামনে তলিয়ে যাওয়া ধান দেখে কৃষক পরিবারে চলছে বোবাকান্না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান জানান, রোববার দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ হেক্টর জমির বোরো আবাদ তলিয়ে গেছে। আরো বেশকিছু জমি তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। মুড়িয়া হাওরের বড় বিল, পৌরসভা, মাথিউরা ও তিলপারা এলাকার কিছু বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

মুড়িয়া হাওরের কৃষক মনুহর আলী বলেন, অতিবৃষ্টিতে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আমার পাকা ধান তলিয়ে যায়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কৃষক কবির মিয়া বলেন, বজ্রপাত আতঙ্কে শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটছেন না। তাই বজ্রপাতের ভয় না পেয়ে নিজেই পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে হাওরে ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছি।

মিরসরাইয়ে অন্ধকারে ২০ হাজার গ্রাহক

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কালবৈশাখীতে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটেছে। গাছপালা উপড়ে পড়ে, বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে এবং তার ছিঁড়ে প্রায় ২০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। রোববার দুপুরের পর হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। ঝড়ের শুরুতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায় এবং জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে আসে।

গাছবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা নুর হোসেন মামুন বলেন, ‘দুপুরে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর এখনো আসেনি। প্রায় আট ঘণ্টা হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ অফিসে ফোন দিলে তারা জানায় কাজ চলছে, একটু সময় লাগবে।’

বিষুমিয়ার হাট এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘গত কদিন ধরেই লোডশেডিং চলছে। আজ তো সারা দিন বিদ্যুৎ নেই। কখন আসবে, তাও নিশ্চিত নয়।’

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর বারইয়ারহাট অফিসের ডিজিএম হেদায়েত উল্লাহ বলেন, ‘গাছের ডাল ভেঙে লাইনের ওপর পড়েছে, অনেক জায়গায় তার ছিঁড়ে গেছে। এতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। দ্রুত বিদ্যুৎ লাইন চালুর চেষ্টা চলছে।’

ধান বাঁচাতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাঠে কৃষক

সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে গুড়াডুবা উপপ্রকল্পের একটি বাঁধ ভেঙে গত শনিবার ভোর রাত থেকে বোয়ালা হাওরে ঢুকছে পানি। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন হাওরের কৃষকরা। পানির তোড়ে তলিয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমিসহ কাটা ধান। আর সেই ধান বাঁচাতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মরিয়া হয়ে লড়ছেন বোয়ালা হাওরের কৃষক শাজাহান মিয়া।

গলহা গ্রামের বাসিন্দা কৃষক শাজাহান মিয়া শনিবার যে ধান কেটেছিলেন, রোববার সেই ধান নৌকায় করে হাওরের মাঝ থেকে তীরে আনেন তিনি। সঙ্গে ছিল তার ৯ বছর বয়সি ছেলে।

মধ্যনগর ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান, বোয়ালা হাওরে জলাবদ্ধতায় ১৩০ হেক্টর এবং কলমাকান্দার একটি বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে ৫০ হেক্টর জমি আগেই তলিয়ে গেছে। এই বাঁধ ভাঙায় ২০ হেক্টর জমি ডুবে যাবে।

মধুপুরে ৫০০ বিঘার পাকা ধান নিমজ্জিত

টাঙ্গাইলের মধুপুরে গত কদিনের ভারী বর্ষণে হাওদা বিলের প্রায় ৫০০ বিঘা জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কৃষকের স্বপ্ন মাটি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কাকরাইদ গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন জানান, হাওদা বিলে এবার বর্গাজমি পাঁচ বিঘা আবাদ করেছি। ধানও হয়েছে ভালো। কিন্তু একদিনের বৃষ্টিতে সব ডুবে গেছে।

কৃষক শাহীন মিয়া বলেন, সাড়ে পাঁচ পাকি জমির সব ধান ডুবে গেছে। এক ছটাক ধানও ঘরে তুলতে পারব না। আমার মতো শত শত কৃষকের একই অবস্থা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা জানান, হঠাৎ ভারী বর্ষণে মধুপুরের বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চলের ধানিজমি পানিতে ডুবে গেছে।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন