৪ শিক্ষকের ৩ জনই একই পরিবারের, বিদ্যালয় ভবন যেন গরু-ছাগলের খামার

উপজেলা প্রতিনিধি, বোরহানউদ্দিন (ভোলা)

৪ শিক্ষকের ৩ জনই একই পরিবারের, বিদ্যালয় ভবন যেন গরু-ছাগলের খামার

শৈশবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। স্কুলের প্রথমদিনই অভিভাবকরা হাত ধরে নিয়ে গিয়ে তুলে দিতেন শিক্ষকদের কাছে। এরপর হাসিমুখে বলতেন, ‘হাড়গুলো আর ‘প্রাণটা’ রেখে দেবেন, মাংস আপনাদের’। ভয়ংকর একথা শুনেই শিক্ষকের লতানো বেতের দিকে চোখ যেতো শিক্ষার্থীর। রসিক শিক্ষকরাও সহাস্যে বলতেন, ‘কত গরু পিটিয়ে মানুষ করেছি, আর ও তো ভদ্র ঘরের সন্তান’। এসব শিক্ষকদের বাস্তব জীবনে গরু পিটিয়ে মানুষ করতে দেখার অভিজ্ঞতা কারো আছে কিনা জানা নেই। তবে ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ১৩৬নং দক্ষিণ দেউলা মুন্সীবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয় গিয়ে দেখা গেছে মূল স্কুল ভবনটি সত্যিকার অর্থেই গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছে।

‎ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের ১৩৬নং দক্ষিণ দেউলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—এক সময়ের স্বাভাবিক শিক্ষাঙ্গণ—আজ যেন হারিয়ে ফেলেছে তার প্রকৃত চেহারা। দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ বিদ্যালয়টি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘পারিবারিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। আর বাস্তব চিত্র? সেটি আরও উদ্বেগজনক—বিদ্যালয়ের ভবনই পরিণত হয়েছে গরু-ছাগলের খামারে।

বিজ্ঞাপন

‎সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক। পুরো ভবনের চারপাশে গরু-ছাগলের বিষ্ঠা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় তলার কক্ষগুলোতেও পশুর মলমূত্র আর তৃতীয় তলায় একটি কক্ষের সামনে খোলা জায়গায় তিনজন শিক্ষক একত্রে ক্লাস নিচ্ছেন। দুর্গন্ধে সেখানে অবস্থান করাই কষ্টকর অথচ সেই পরিবেশেই পাঠ নিতে বাধ্য হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

‎বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট না থাকলেও রয়েছে পারিবারিক আধিপত্যের অভিযোগ। মোট ৪ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ ৩ জনই একই পরিবারের সদস্য। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিবারই বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। পূর্বে বিদ্যালয়ের সভাপতিও ছিলেন ওই পরিবারের একজন সদস্য, বর্তমানে প্রধান শিক্ষক, তার বোন ও স্ত্রী—সবাই মিলে দায়িত্ব পালন করছেন।

‎‎অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিরও শেষ নেই। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির অপব্যবহার, নোংরা পরিবেশে পাঠদান, সরকারি ভবন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা—সব মিলিয়ে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, স্কুল সবসময় নোংরা থাকে। গরু-ছাগলের ময়লা পায়ে লাগলে খুব খারাপ লাগে। মাঝে মাঝে স্কুলে আসতেই ইচ্ছা করে না।

‎স্থানীয় বাসিন্দা হোসেন মিয়ার অভিযোগ,‎ শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নেন না। অনেক সময় দুপুর ১টা-২টার মধ্যেই স্কুল ছুটি দিয়ে চলে যান।

‎‎এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মাওলা বলেন, ‎সম্প্রতি বিদ্যুতের মিটার চুরি হয়েছে, তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রামের লোকজন বর্ষার সময় নিচতলায় গরু-ছাগল বেঁধে রাখে। আমরা নিষেধ করলেও তারা শোনে না।

‎‎তিনি আরও জানান, পুরনো ভবনের চাবি আগের প্রধান শিক্ষক নিয়ে গেছেন। ফলে আমরা চাইলেও সেটি ব্যবস্থাপনায় আনতে পারছি না।

‎বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৬ জন, আর শিক্ষক রয়েছেন ৪ জন। তবে বাস্তব চিত্রে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কম বলে জানা যায়।

‎উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আমার দেশকে জানান, এ বিষয়ে সঠিক তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়অ হবে।

‎‎এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি—বিদ্যালয়টিকে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্তত একটি স্বাভাবিক শিক্ষাঙ্গণ ফিরে পায়।

এএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...