বাংলাদেশের প্রায় সব জেলার কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার আছে। তেমনিভাবে জামালপুরের আছে মিল্লি ভাত যা এ জেলার মানুষের আবেগ ও ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে। অনেকে এটিকে ম্যান্দা বা পিঠালি নামেও ডেকে থাকেন। এ জেলার অসংখ্য সংস্কৃতি ও রেওয়াজের মধ্য থেকে যদি একটিকে শ্রেষ্ঠ বলে ধরা হয়, তবে নিঃসন্দেহে তা হবে বিশেষ এ ভাত। বহু বছর ধরে চলে আসা এই মুখরোচক খাবার শুধু জামালপুর নয়, গোটা দেশের স্বাদপ্রেমী মানুষের কাছে এখন কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। একটা সময় এই খাবার শুধু মজলিস, বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হলেও বর্তমানে বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁর মেন্যুতে যুক্ত হয়েছে।
বলা হয়ে থাকে মিল্লি ভাত একবার যে খেয়েছে, সে আর ভুলতে পারে না। এর ঘ্রাণ আর অতুলনীয় স্বাদের স্মৃতি মনে গেঁথে থাকে দীর্ঘদিন। ধারণা করা হয়, জামালপুরের মানুষ প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটিকে ঘিরে পালন করছে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান। বর্তমানে হোটেল-রেস্তোরাঁয় পাওয়া গেলেও মজলিসের মিল্লির যে স্বাদ তা এখনো অতুলনীয়।
ঐতিহ্যবাহী এই খাবার রান্না প্রক্রিয়া যেমন জটিল, তেমনই শিল্পসম্মত। প্রক্রিয়া সহজ না হওয়ায় সবাই এটি রান্না করতে পারে না। এজন্য জামালপুরে গড়ে উঠেছে নির্দিষ্ট কিছু বাবুর্চির দল, যারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রপ্ত করে চলেছে এই রান্নার পদ্ধতি।
মিল্লির প্রধান উপকরণ হলো মাংস এবং চালের গুঁড়া। গরু, মহিষ বা খাসির মাংস ব্যবহার করা হলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় গরুর মাংসের মিল্লি। হাড় ও চর্বিযুক্ত মাংস এই খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। মাংস ছাড়াও এতে ব্যবহার হয় অন্তত ২০ ধরনের মসলা—পিঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা, এলাচ, দারুচিনি, ধনে গুঁড়া, তেজপাতা ইত্যাদি। মাংস মসলা দিয়ে ১-২ ঘণ্টা ম্যারিনেট করে, লাকড়ির চুলায় ৩ ঘণ্টা ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। রান্নার শেষ পর্যায়ে বিশেষ কায়দায় চালের গুঁড়া ছিটিয়ে মিল্লিকে করা হয় ঘন এবং সুগন্ধি। সবশেষে বাগাড় দিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য স্বাদ।
জেলাটিতে ঐতিহ্যের সঙ্গে উৎসবের সমন্বয় করছে এটি। বড় কোনো আয়োজন মানেই মিল্লি ভাতের আয়োজন। ২০০ থেকে ১০,০০০ মানুষের জন্য ৫টি থেকে শতাধিক বড় ডেগে রান্না হয় এই খাবার। ছোট-বড় নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে বসে খায় খড় বিছানো মাটিতে। এক সময় কলাপাতায় পরিবেশন করা হতো মিল্লি, যদিও বর্তমানে থালা কিংবা মাটির পাত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। মিল্লিকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ছোট আয়োজনগুলো বাড়ির উঠানে করা হলেও বড় আয়োজনের সময় সবাইকে ফসলি জমিতে বসে খেতে হয়। এই সংস্কৃতির মধ্যে নিহিত আছে সামাজিক ঐক্য ও সৌহার্দ্যের গভীর বার্তা।
বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী খাবারকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে গড়ে উঠেছে ‘মিল্লি সংঘ’নামে একটি সংগঠন। যারা প্রতি বছর আয়োজন করে মিল্লি উৎসব। যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে উপভোগ করেন জামালপুরের এই সুস্বাদু খাবার।
জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং মিল্লি সংঘের কর্ণধার অ্যাডভোকেট রিশাদ রেজুয়ান বাবু বলেন, আমরা মিল্লিকে জামালপুরের জাতীয় খাবার হিসেবে দেখি। এই ঐতিহ্যকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।
আজকের দিনে জামালপুরে কেউ অতিথি হলে, তাকে আপ্যায়নের প্রথম পছন্দই হয় মিল্লি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই স্বাদ এখন ছড়িয়ে পড়ছে দূর-দূরন্তেও। তবে যারা একবার মিল্লির আসল স্বাদ পেয়েছেন, তাদের কাছে মিল্লি শুধুই খাবার নয়—এটি একটি স্মৃতি, একটি সংস্কৃতি, একটি ভালোবাসা। যুগ যুগ ধরে জামালপুরবাসীর গর্ব এই খাবার এখন জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

