শিশু ধর্ষণ: ক্ষোভে ফুঁসছে চট্টগ্রাম, আজ আদালতে তোলা হবে অভিযুক্তকে

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম

শিশু ধর্ষণ: ক্ষোভে ফুঁসছে চট্টগ্রাম, আজ আদালতে তোলা হবে অভিযুক্তকে

চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে টানা ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইট-পাটকেল ও পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট, ছররা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিআর সেলে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে।

উত্তেজিত জনতা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সড়কে বেশ কয়েকটি গাড়ি ও স্থাপনায় হামলা চালায়। রাতভর এমন সহিংস পরিস্থিতির পর সকালে পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে। তবে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযুক্ত ধর্ষক মনির হোসেনকে গভীর রাতে এলাকার বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পুলিশের পোশাক পরিয়ে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। দুপুরে জুমার নামাজের আগে-পরে যে কোনো সময় তাকে আদালতে হাজির করা হবে। তবে নিরাপত্তা কারণে ধর্ষক মনিরকে কখন আদালতে তোলা হবে, সে সময়টা জানায়নি পুলিশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত মনিরকে নিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পুলিশ।

বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা ছিল সবচেয়ে বেশি। আর এই কারণেই রাতভর অগ্নিগর্ভ ছিল পুরো বাকুলিয়া এলাকায়। গভীর রাতে এলাকার বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পুলিশের পোশাক পরিয়ে তাকে হেফাজতে আনা হয়। ঘটনাটি বাকুলিয়ায় হলেও উত্তেজিত জনতা বাকুলিয়া থানায় হামলা করতে পারে এই আশঙ্কায় ডিবি হেফাজতে নিয়ে আসা হয় তাকে। সকাল থেকে আদালত চত্বর পুলিশের নজরদারিতে আছে। থানায় ধর্ষণের ঘটনায় একটি ও সংঘর্ষের ঘটনায় আরেকটিসহ মোট দুটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। আদালত চত্বরে বিক্ষুব্ধ জনতার অবস্থান পর্যবেক্ষণের পর অভিযুক্তকে যে কোনো সময় আদালতে তোলা হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে সরাসরি আদালতে তোলা ঝুঁকি মনে করলে করোনা কালের মতো ভার্চুয়ালিও এই প্রক্রিয়া শেষ করার প্রস্তুতি আছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোডের ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামের একটি ভবনে এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের শিকার তিন বছরের শিশুটির মা একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন এবং বাবা রিকশাচালক। ঘটনার সময় শিশুটির বাবা-মা দুজনই বাড়ির বাইরে ছিলেন। বাড়িতে শিশুটি তার নানির সঙ্গে ছিল। বিকেলে শিশুটি ঘুমিয়ে পড়লে তার নানি রান্নাঘরে রান্ন করছিলেন।

এ সময় বাড়ির পাশের ডেকোরেশন দোকানের কর্মচারী মনির হোসেন তাকে ঘর থেকে বের করে পাশের গুদামে নিয়ে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে গুদামের বাইরের গলিতে ফেলে রেখে যায় মনির। সেখান থেকে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে। কিছু সময় পর তার জ্ঞান ফিরে এলে শিশুটি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি সবাইকে জানিয়ে দেয়।

এ সময় স্থানীয়রা ধর্ষককে ধরে পাশের একটি মাদ্রাসা ভবনের নিচে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয়। কিন্তু পুলিশ আসতে আসতে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তারা পুলিশের কাছ থেকে ধর্ষক মনিরকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরা শাস্তি দেওয়ার দাবি জানাতে থাকে। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। অভিযুক্ত মনিরকে নিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পুলিশ।

পরে অতিরিক্ত পুলিশসহ র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে এলাকাবাসীকে বুঝিয়ে তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের দাবিতে অটল থাকে। এতেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিআর সেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ।

টানা ৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত ১২টার দিকে এলাকার বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অভিযুক্তকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে হেফাজতে নিয়ে আসে। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ে স্থানীয়রা। একপর্যায়ে বাকুলিয় এক্সেস রোড, চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। এ সময় পুলিশের একটি পিকআপ গাড়িতেও আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। ভাঙচুর করা হয়ে বেশ কয়েকটি গাড়ি, একটি কমিউনিটি সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। রাত ২টা পর্যন্ত চলা দফায় দফায় সংঘর্ষে ৩ জন সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে ৪ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন