উজিরপুরে ২৪ কি.মি সড়ক সংস্কারহীন, চরম ভোগান্তিতে পাঁচ ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষ

উজিরপুরে ২৪ কি.মি সড়ক সংস্কারহীন, চরম ভোগান্তিতে পাঁচ ইউনিয়নের দুই লাখ মানুষ

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সানুহার-ধামুরা হয়ে সাতলা পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার সড়ক দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে টেন্ডার জটিলতায় সড়কের একটি বড় অংশের সংস্কারকাজ আটকে থাকায় পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষ বছরের পর বছর চরম ভোগান্তিতে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি ও কাদায় তলিয়ে গেছে সড়ক। ফলে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যান, বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়কটি নির্মাণের পর গত আট বছরে বড় ধরনের সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। বিশেষ করে ঈদগাহ মার্কেট এলাকায় আধা কিলোমিটারের বেশি অংশে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় সড়কে কাদা ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ওই অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি সড়কের খানাখন্দে লাশবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্স, অটোরিকশা ও বাস আটকে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকার ঘটনাও ঘটেছে। রোগী ও লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি জরুরি সেবাগ্রহীতারাও দুর্ভোগে পড়ছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, ধামুরা থেকে সানুহার হয়ে জল্লা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সড়কের পিচ উঠে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। কোথাও গর্তে পানি জমে থাকায় এর গভীরতা বোঝার উপায় নেই। বৃষ্টির পর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে যানবাহনগুলোকে একে অপরকে পাশ কাটাতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

এই সড়কে চলাচলকারী ইজিবাইকচালক রবিউল ইসলাম হাওলাদার বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে আমাদের গাড়ি চালাতে হয় প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে। ভয়ে ভয়ে গাড়ি চালাতে হয়। গর্ত এড়াতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হচ্ছে। গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে, ইনকামও কমে গেছে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষের উপজেলা সদর, হাসপাতাল, থানা, ব্যাংক, বাজার ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে যাতায়াতের প্রধান পথ এই সড়ক। প্রতিদিন গড়ে ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ সড়কটি ব্যবহার করেন। স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত এই পথে যাতায়াত করে।

এইচ এম ইনস্টিটিউশন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তরিকুল বলেন, ‘বৃষ্টি হলে স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। যাওয়া-আসার পথে কাদা-পানিতে ভিজে একাকার হয়ে যেতে হয়।’

সড়কটিতে বাস চলাচল করলেও খানাখন্দের কারণে হেলে-দুলে ও প্রচণ্ড ঝাঁকুনির মধ্য দিয়ে যাত্রীদের গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। এই পথে চলাচলকারী বাসচালক লোকমান হোসেন বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে বাস চালানো এখন খুবই কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। তবু উপায় নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। খানাখন্দের কারণে প্রায়ই গাড়ি বিকল হয়। গাড়ির পাতি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায়।’

টেন্ডার জটিলতায় আটকে সংস্কার

উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, জনগুরুত্বপূর্ণ ২৪ কিলোমিটার সড়কটি সংস্কারের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিনটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ ফুট প্রশস্ত সড়কটি দুই পাশে দুই ফুট করে বাড়িয়ে ১৪ ফুট করা এবং দুই পাশে আরও চার ফুট মাটির শোল্ডার নির্মাণসহ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এর মধ্যে সানুহার থেকে ধামুরা এবং ধামুরা থেকে জল্লা পর্যন্ত মোট ১৬ কিলোমিটারের দুটি প্যাকেজের কাজ পায় ইফতি-ইটিসিএল নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অপর প্যাকেজে জল্লা থেকে সাতলা পর্যন্ত আট কিলোমিটার সড়কের কাজ পায় বরিশালের আমিন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই অংশের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, ইফতি-ইটিসিএলের মালিক পিরোজপুর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ। কাজ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি কিছুদিন কাজ করে। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মহিউদ্দিন মহারাজ দেশ ছাড়েন। এরপর প্রতিষ্ঠানটির কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

একপর্যায়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ওই দুটি প্যাকেজের দরপত্র বাতিল করে।

পরে সড়কের আট কিলোমিটার অংশ দুই পাশে বর্ধিত করে সংস্কারের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৪ কোটি ২০ লাখ টাকার এই কাজ পেয়েছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকার মেসার্স মোমিনুল হক নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিকে আগামী এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে বাকি আট কিলোমিটার সড়কের জন্য এখনো নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা যায়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়া অংশটি দিন দিন আরও বেহাল হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা যুক্ত হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন অংশ এখন প্রায় চলাচলের অনুপযোগী।

বরিশাল বাস মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মিরাজ শিকদার বলেন, জরাজীর্ণ সড়ক দিয়ে বড় বড় পণ্যবাহী ট্রাক ও গাছের গুঁড়ি বহনকারী যান চলাচল করায় সড়কের অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। এখন এই সড়কে যানবাহন চালানোর মতো উপযোগী পরিবেশ নেই। বিকল্প না থাকায় তাঁরা নিরুপায় হয়ে বাস চলাচল অব্যাহত রেখেছেন।

তিনি বলেন, ‘বরিশাল জেলা বাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে নিজেদের অর্থায়নে বেশ কয়েক দফা সড়কের খানাখন্দ সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু তা বেশিদিন টেকেনি। ঈদগাহ মার্কেট এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় ওই অংশ একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।’

সংস্কারের পাশাপাশি ড্রেনেজের দাবি

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সড়কের বর্তমান দুর্ভোগের অন্যতম কারণ জলাবদ্ধতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় সড়কের ওপর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এতে পিচ উঠে গিয়ে গর্ত তৈরি হয় এবং সড়কের স্থায়িত্ব কমে যায়।

তারা দ্রুত সড়কটির টেকসই সংস্কারের পাশাপাশি দুই পাশে পরিকল্পিত ড্রেনেজব্যবস্থা নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক নুরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, রাস্তার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দ্রুত টেকসই সংস্কার না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী সুব্রত রায় বলেন, ২৪ কিলোমিটার সড়কটি তিনটি ভাগে দরপত্র দেওয়া হয়েছিল। একটি প্যাকেজের কাজ চলমান রয়েছে। বাকি দুটি প্যাকেজের কাজ হয়নি। এখন নতুন করে ওই দুটি প্যাকেজের একটির দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে। বাকি একটি প্যাকেজ এখনো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় দরপত্র আহ্বান করা যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন