বরিশালে মাদক মামলার সংক্ষিপ্ত বিচারে মিলছে সুফল

নিকুঞ্জ বালা পলাশ, বরিশাল

বরিশালে মাদক মামলার সংক্ষিপ্ত বিচারে মিলছে সুফল
আমার দেশ গ্রাফিক্স

মাদক ও অপরাধ দমনে সামারি ট্রায়াল (সংক্ষিপ্ত বিচার) শুরু করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি)। প্রথমবারের মতো এই পদ্ধতি প্রয়োগে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে। গত দুই মাসে এই পদ্ধতিতে নগরীতে ২১২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় ৪৯১ জনকে গ্রেপ্তার করে অপরাধ পর্যালোচনাসাপেক্ষে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে ।

পুলিশ ও বিচার বিভাগের এমন উদ্যোগে আতঙ্কে রয়েছে মাদক বিক্রেতা ও মাদকসেবীরা। পুলিশের এমন উদ্যোগে মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় দিনে দিনে নগরীজুড়ে অপরাধ প্রবণতা কমে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, তিন মাস আগে প্রথমবারের মতো বিএমপির অধীন চারটি থানায় সামারি ট্রায়াল পদ্ধতি চালু হয়। সেপ্টেম্বর মাসে এ পদ্ধতিতে বরিশাল নগরীতে ১২২টি মামলা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ১৯৮ জনকে। অন্যদিকে চলতি অক্টোবর মাসে এ পর্যন্ত ৯০টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে কমপক্ষে ৩০০ জনকে।

এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকার চারটি থানার মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় সামারি ট্রায়াল পদ্ধতিতে ৫২ মামলার মাধ্যমে ১২২ জনকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। একইভাবে বন্দর থানায় ছয়টি মামলায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। একই মাসে এয়ারপোর্ট থানায় তিনটি মামলার মাধ্যমে আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় এবং কাউনিয়া থানায় ৬১ জনের বিরুদ্ধে ৬১টি মামলা দায়ের করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা কামরুল হাসান আমার দেশকে বলেন, সামারি ট্রায়াল (সংক্ষিপ্ত বিচার) পদ্ধতিতে বরিশাল মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে তাৎক্ষণিক বিচারকাজ সম্পন্ন করছেন মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আদালতের বিচারকেরা। গত সেপ্টেম্বর মাসে ১৯১ মামলায় তিন শতাধিক আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে তাৎক্ষণিক সাজা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সামারি ট্রায়াল পদ্ধতিতে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় সাধারণ মানুষ এমনকি ভুক্তভোগীর পরিবারও সুফল পাচ্ছে। বিচারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে না বিচারপ্রার্থীকে।

এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিতীয় বিচার আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মাইনুল ইসলাম সজল আমার দেশকে বলেন, সামারি ট্রায়াল পদ্ধতির মাধ্যমে আদালতের বিচারকরা তাৎক্ষণিক আসামিকে সাজা বা মুক্তি দিচ্ছেন। এটি সত্যিই প্রসংশনীয় উদ্যোগ।

তিনি বলেন, আগে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেপ্তার হলেও দুই-চার দিনের মধ্যে জামিনে মুক্ত হতে পারত আসামিরা। এরপর আবার একই পেশায় জড়িয়ে পড়ত। ফলে সমাজের অবরাধ প্রবণতা না কমে বেড়েই চলছিল। কিন্তু সামারি ট্রায়াল পদ্ধতিতে তাৎক্ষণিক বিচার হওয়ায় জামিনের কোনো সুযোগ নেই। হাইকোর্ট থেকেও বিচার হওয়া ব্যক্তিদের সহসা জামিন মিলছে না। ফলে সমাজের অপরাধ প্রবণতা কমছে। এটি মাদক নিয়ন্ত্রণে সত্যিই একটি প্রশংসনীয় বিচার পদ্ধতি।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার আমার দেশকে বলেন, বিগত সময়ে আমরা দেখেছি অল্পসংখ্যক মাদকসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রেতা বা মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হলেও আইনের ফাঁক-ফোকরের মাধ্যমে পরদিনই জামিনে বের হয়ে ফের মাদকসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ত। ফলে মাদক বিক্রেতা বা মাদকসেবীদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছিল না।

তিনি বলেন, আমরা সমাজে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে কোনো না কোনোভাবে মাদকের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। মাদকসহ গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়েই আবার একই পেশায় যুক্ত হচ্ছিল তারা। তবে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ স্যার বরিশালে যোগদানের পর মাদকসহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সামারি ট্রায়ালের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ইতোমধ্যে মাদক নিয়ন্ত্রণে আমরা ব্যাপক সফলতা পাচ্ছি। আশা করি শিগগির নগরীর মাদকসহ অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।

এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ আমার দেশকে জানান, তিনি বরিশালে যোগদানের পর মাদকসহ নানা ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গত তিন মাস ধরে সামারি ট্রায়াল পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, সারা দেশে এ পদ্ধতির তেমন প্রয়োগ নেই। কিন্তু বরিশালের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি কাজে আসছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, আমরা লক্ষ করেছি গ্রেপ্তারের দুই-চার দিনের মধ্যেই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা জামিন পেয়ে যায়। ফলে তারা উৎসাহিত হয়ে আবার ব্যবসা শুরু করায় মাদকসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে আসামিকে গ্রেপ্তারের পর সরকারিভাবেই ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। সব প্রমাণসহ আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে এবং আদালত তাৎক্ষণিক বিচার করছে। এতে মাদকসেবী বা বিক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে অনেকেই এখন মাদক থেকে দূরে থাকছে। বিষয়টি মাথায় রেখেই মাদকসহ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সামারি ট্রায়াল পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছি এবং বেশ ভালো সুফল মিলছে।

তিনি আরো বলেন, নগরীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ও মাদক নির্মূলে প্রতিদিন আট থেকে ১০টি টিম কাজ করছে। আমরা আশাবাদী, বরিশাল নগরী থেকে মাদক বিক্রেতা ও অপরাধীরা পালাবে।

এদিকে, বরিশাল মহানগরীতে মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এ ধরনের তৎপরতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে। বরিশাল নগরীর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও আমার দেশ পাঠকমেলা বরিশাল জেলা শাখার সদস্য সচিব রাজু আহম্মেদ বলেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ অপরাধ প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সামারি ট্রায়াল পদ্ধতির পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলে মহানগরীতে মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আরো অগ্রগতি আসবে। এ উদ্যোগের কার্যকারিতা ধরে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক তৎপরতার পাশাপাশি মাদক কারবারি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন