আশ্বিনের শেষ ও কার্তিকের মধ্যবর্তী সময়ে মাঠে কোনো কাজ না থাকায় গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। ফলে লালমনিরহাটের হাজার হাজার দিনমজুর কাজের সন্ধানে গ্রাম ছাড়ছেন। জেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনে প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্তে যাওয়ার জন্য কর্মহীন দিনমজুরদের ভিড় জমছে। এসব শ্রমিক গ্রাম্য মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়ে পরিবারের খোরাকি ও যাতায়াত ভাড়া জোগাড় করছেন। অনেকে পুরো বাস বা ট্রেন ভাড়া না পেয়ে বাসের ছাদ অথবা ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে গাদাগাদি করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি দিচ্ছেন।
সরেজমিনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের অতিদরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এই সংকটে পড়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছেন অতিদরিদ্র মানুষ। গ্রামে কাজের সুযোগ না থাকায় সাড়ে ২২ শতাংশ পরিবার শহরমুখী হয়েছে এবং ১৫ শতাংশের বেশি ভালো কিছুর আশায় গ্রাম ছেড়েছে। কৃষির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে কাজ না থাকা, নদীভাঙন এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিবছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও রংপুরের একটি বড় অংশের মানুষ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাড়ি জমায়।
এক নমুনা জরিপে দেখা গেছে, মফস্বলের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাবোধ সবচেয়ে বেশি। এই নিরাপত্তাহীনতা কর্মসংস্থানের অভাব এবং রোগ-শোক, পারিবারিক কলহ, বিবাদ ও জমি দখলের আতঙ্কের মতো বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাজনিত হতাশা থেকে তৈরি হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকালে লালমনিরহাট বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায় কর্মহীন মানুষের ভিড়। পাটগ্রাম উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের মফিজুল ইসলাম (৩৮) এবং আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধন এলাকার তাজুল ইসলাম (৪৮) জানান, অভাবের সময় দাদনের টাকা শোধ করতে না পারায় নতুন করে দাদন মিলছে না। ২৫ শতাংশ মাসিক সুদে যেটুকু টাকা সংগৃহীত হয়েছে, তার সিংহভাগ পরিবারের খোরাকিতে ব্যয় করে মাত্র ৮০ থেকে ৯০ টাকা হাতে নিয়ে বাসের কন্ডাক্টরের সঙ্গে দর-কষাকষি করে তারা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত গড্ডিমারী চরের দিনমজুর কবির হোসেন (৫৫) জানান, কাজের পরিমাণ কমলেও শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে, তাই বাধ্য হয়েই তিনি শহরের পথ ধরেছেন।
পাটগ্রামের বড়খাতা ইউনিয়নের কবির হোসেন জানান, গ্রামীণ শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসংস্থান নেই। পুরুষরা চালকের কাজ বা দূরবর্তী শহরে পাড়ি জমালেও নারীরা ঘরে বেকার বসে থাকেন। গ্রামে ঝিয়ের কাজও মেলে না।
লালমনিরহাট মূলত কৃষিনির্ভর একটি জেলা। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার মোট আয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। শিল্প-কারখানা না থাকায় ধান, পাট, তামাক, ভুট্টা, আলু ও শাকসবজি চাষই এখানকার মানুষের প্রধান ভরসা। বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও গ্যাস সংযোগ ও উন্নত অবকাঠামোর অভাবে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাঞ্চলের মৌসুমি বেকারত্ব দূর করতে প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সংরক্ষণাগার এবং তরুণদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
শ্রমিক অধিকার নেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে আগামীতে শহরমুখীদের সংখ্যা আরও বাড়বে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

