পটুয়াখালীর ‘সাগরকন্যা’ খ্যাত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের স্বস্তির বদলে এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেলের অবাধ বিচরণ। সৈকতের বালিয়াড়িতে উচ্চগতিতে মোটরসাইকেল চলাচলের ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন পর্যটক ও সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে আসা পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে—এমনকি টুরিস্ট পুলিশ বক্সের সামনেও—নিয়ম ভেঙে অবাধে চলাচল করছে মোটরসাইকেল। অনেক চালক পর্যটকদের ঘোরানোর জন্য দরদাম করছেন, কেউ ঘণ্টাভিত্তিক চুক্তিতে বাইক ভাড়া দিচ্ছেন, আবার কেউ বেপরোয়াভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সৈকতজুড়ে।
শুধু চালকরাই নয়, অনেক পর্যটকও নিজেরাই মোটরসাইকেল নিয়ে সৈকতে প্রবেশ করছেন। তাদের দাবি, সৈকতে মোটরসাইকেল চালানো নিষিদ্ধ—এ বিষয়ে তারা অবগত ছিলেন না এবং কেউ তাদের বাধাও দেয়নি। এদিকে জীবিকার তাগিদ ও প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকায় চালকরাও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।
সৈকতে মাইকিং করে সচেতনতা বাড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবে টুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পর্যটকরা। মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটকদের নিরাপত্তা—দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্টরা এর দায় এড়াতে পারবে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রিপন-টুম্পা দম্পতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছি। কিন্তু মোটরসাইকেলের কারণে বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদে হাঁটা যাচ্ছে না। সবসময় একটা ভয় কাজ করছে।’
খুলনা থেকে আগত পর্যটক আবুল হোসেন বলেন, ‘সৈকতে মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্যে পরিবার নিয়ে নিরাপদে সময় কাটানো যাচ্ছে না। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
সৈকতে বাইক চালানোর বিষয়ে এক চালকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, ‘সবাই চালাচ্ছে তাই আমরাও চালাই। আমাদের তো কেউ নিষেধ করেনি।’
এ বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা কুয়াকাটাবাসী’র সভাপতি হাফিজুর রহমান আকাশ বলেন, ‘সৈকতে এভাবে মোটরসাইকেল চলতে থাকলে কুয়াকাটা তার আকর্ষণ হারাবে। পর্যটকদের অভিজ্ঞতা খারাপ হলে ভবিষ্যতে পর্যটন খাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।’
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘পর্যটন কেন্দ্রের পরিবেশ রক্ষায় ছাতা-বেঞ্চির এরিয়ার ভেতরে যান্ত্রিক যান চলাচল বন্ধ হওয়া জরুরি। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় মোটরসাইকেল জোন করা যেতে পারে। এতে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং পর্যটকরা স্বস্তিতে বিচরণ করতে পারবেন।’
কুয়াকাটা টুরিস্ট পুলিশ রিজিয়নের পুলিশ পরিদর্শক তাপস চন্দ্র রায় বলেন,‘আমরা মাইকিং করছি, কিন্তু তাদের পুরোপুরি থামাতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে কুয়াকাটা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ বলেন,‘আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান চালাই। কিন্তু অভিযান শেষ হলেই আবার মোটরসাইকেল চলাচল শুরু হয়। এটি বন্ধে টুরিস্ট পুলিশ ও স্থানীয়দের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
স্থানীয়দের দাবি, ‘নামমাত্র’ অভিযান নয়—স্থায়ীভাবে সৈকতে মোটরসাইকেল প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসনের শিথিলতার সুযোগে কুয়াকাটার পর্যটন পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তাও এখন বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

