পটুয়াখালীতে দীর্ঘদিন পর সম্মেলনকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে জেলার দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি। দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অত্যাচার, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলায় বাড়িঘর ছাড়া নেতাকর্মীরা ৫ আগস্টের পর আবার এলাকার রাজনীতিতে সরব হয়েছেন। সম্মেলনের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে জেলা শহর ছাড়িয়ে উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে। সম্মেলনের দিন-ক্ষণ ঘোষণার পর থেকে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ ও নানা সমীকরণ। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টমুক্ত পটুয়াখালীতে কাদের হাতে থাকবে জেলা বিএনপির সোনার কাঠি।
দীর্ঘদিনের দ্বিধাবিভক্ত পটুয়াখালী বিএনপি আবার কি ঐক্যের মোহনায় মিলিত হবে, না আগের চিত্র পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেখবে জেলাবাসী। আর তাই আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে জেলার ঐক্যবদ্ধ কমিটি। আগামী ২ জুলাই বুধবার সকাল ১০টায় শেরে বাংলা সড়কস্থ ব্যায়ামাগারে ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সম্মেলন উদ্বোধন করবেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ চুন্নু মিয়ার সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব স্নেহাংসু সরকার কুট্টির সঞ্চলনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশারফ হোসেন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু, সহদপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেন, সহপ্রচার সম্পাদক মো. আসাদুল করিম শাহীন, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক মো. দুলাল হোসেন, সদস্য হাসান মামুনসহ পটুয়াখালীর সব কেন্দ্রীয় নেতা।
পটুয়াখালী জেলা বিএনপির দুই বলয়ের একটির নেতৃত্বে আছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসভাপতি, সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী। অপর বলয়ের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব স্নেহাংসু সরকার কুট্টি। এই দুই বলয়ের স্ব স্ব প্রার্থীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে প্রচার-প্রচারণা। একই বলয়ের ভেতর সাধারণ সম্পাদক পদে আবার গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে চলছে মিছিল, শোডাউন। ডিজিটাল পোস্টার, ফটোকার্ডসহ নানাভাবে প্রচারণায় নতুন নতুন মাত্রা যোগ করছেন। সম্মেলনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ চুন্নু মিয়া, সদস্য সচিব স্নেহাংসু সরকার কুট্টি এবং আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মাকসুদ আহমেদ বায়েজীদ পান্না। এদের মধ্যে মাকসুদ আহমেদ বায়েজীদ পান্না পটুয়াখালীতে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সমর্থক। এ ছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদে কুট্টি সরকার বলয়ের জেলা বিএনপি সদস্য অ্যাডকোট মো. মজিবুর রহমান টোটন, দেলোয়ার হোসেন নান্নু, জেলা যুবদলের সভাপতি মনিরুল ইসলাম লিটন ও জেলা বিএনপির সদস্য বশির আহমেদ মৃধা। অন্যদিকে আলতাফ হোসেন চৌধুরী সমর্থিত জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৌফিক আলী খান কবির সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দলের সূত্র জানায়, ২০০২ সালের ১৪ এপ্রিল সর্বশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে দ্বিবার্ষিক জেলা কমিটি গঠিত হয়। ২০০৪ সালে ওই কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও তা দিয়েই চলতে থাকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। এদিকে ২০০৯ সালের ৯ জুন জেলা কমিটি ভেঙে আব্দুর রশিদ চুন্নু মিয়াকে আহ্বায়ক করে প্রথমে ৫১ সদস্য এবং পরে ৫৮ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০১৩ সালের ১৪ মে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসভাপতি, সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে সভাপতি ও এমএ রব মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৬৯ সদস্যবিশিষ্ট পটুয়াখালী জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর গঠন করা হয় আবদুর রশিদ চুন্নু মিয়াকে আহ্বায়ক ও স্নেহাংসু সরকার কুট্টিকে সদস্য সচিব করে ৩১ সদস্যবিশিষ্ট বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি।
জেলার সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন বিএনপির তৃনমূল কর্মী আবদুল জব্বার বলেন, ‘আমরা আর কিছু চাই না, ১৬ বছর মিছিল-মিটিং করেছি, হাসিনারে লড়াইাছি এখন সম্মেলন হইবো, আমাগো নেতা তারেক রহমানের কাছে একটাই দাবি ভালো একটি কমিটি চাই’।
দীর্ঘদিন পর জেলা বিএনপির সম্মেলনে ঐক্যের আশাবাদী জেলা জিয়া পরিষদের সহসভাপতি অধ্যাপক মো. ইদ্রিছুর রহমান বলেন, ‘পটুয়াখালীতে আমরা ঐক্যবদ্ধ বিএনপি চাই। আর বিভক্তি চাই না। সামনে নির্বাচন, তাই নেতাদের সব ভেদাভেদ ভুলে ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমন্বয়ের মাধ্যমে কমিটি দেওয়া হোক’। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব স্নেহাংসু সরকার কুট্টি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মোতাবেক সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। সম্মেলনে আট উপজেলা কমিটি, পাঁচ পৌর কমিটি এবং আহ্বায়ক কমিটিসহ ১৪টি ইউনিটের প্রায় দেড় হাজার সদস্য তাদের গোপন ভোটের মাধ্যমে জেলার নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। তিনি গ্রুপিংয়ের কথা অস্বীকার করে বলেন, বিএনপি একটি বিশাল সংগঠন। এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে, থাকবে। তবে সেটা গ্রুপিং নয়। বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক মো. দুলাল হোসেন বলেন, ‘পটুয়াখালী জেলা সম্মেলনের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। সম্মেলনে দুটি অংশ প্রথম পর্বে আলোচনা, সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশ নায়ক তারেক রহমান, দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বচ্ছ ভোটের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। তারপরও ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগী কেউ বাদ পড়লে সমন্বয় করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

