দুর্গম চরে ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ের দোসরগোষ্ঠী ও সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী দ্বারা একটি পরিবার দীর্ঘদিন যাবৎ থেকেছিলেন অন্ধকার ঘরে অবরুদ্ধ। শিকার হন নির্যাতনের। নির্যাতনের শিকার ঐ নারী ও তার দশ বছর বয়সী মেয়েকে আটকে রেখে দিনের পর দিন পালাক্রমে করা হয় ধর্ষণ। তার বৃদ্ধ মা ও শিকার হন লাঞ্ছনার। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে স্বামী সুফিয়ানকে পিটিয়ে ফেলে দেওয়া হয় নদীতে। এমনকি দেড় বছরের মেয়ে সুলতানাও রেহাই পাননি সন্ত্রাসী চক্রের হাত থেকে।
প্রথমে ওই নারীকে ধরতে না পেরে দেড় বছরের শিশুর দিকে ছুড়ে মারেন হাতে থাকা দা। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত প্রাপ্ত হয়ে শিশু সুলতানার জীবন কাটে ধুকে ধুকে। করা হয় লুটপাট এবং গুড়িয়ে দেওয়া হয় ওই পরিবারের বসতঘর। পরে কোনোমতে পালিয়ে আশ্রয় নেন বাবার বাড়ি লক্ষ্মীপুরে।
সাংবাদিকদের কাছে লোমহর্ষক এ ঘটনার বর্ণনা দেন নির্যাতিতা নারী। যে ঘটনা নাড়া দিয়েছে হাজারো মানুষের হৃদয়কে।
ভোলার তজুমদ্দিনের বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম চর মোজাম্মেলে মা ও শিশু কন্যাকে কয়েক দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে নীরব ফরাজী নামের এক চরের ব্লক লিডার। শুধু ধর্ষণই নয়, ওই নারীর চার সদস্যের পুরো পরিবারকে করা হয় অমানুষিক নির্যাতন।
সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার প্রকাশ্যে এসেছে অভিযুক্তের ভাইয়ের পিস্তল হাতে থাকা এক চাঞ্চল্যকর ছবি। এই ছবি প্রকাশের পর পুরো উপজেলা জুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ অস্ত্রের জোরেই মেঘনা নদী ও চর মোজাম্মেল এলাকায় দিনের পর দিন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল এই অপরাধী চক্র।
ছবিতে দেখা যায়, চরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নীরবের ছোট ভাই দুলাল ফরাজী একটি পিস্তল হাতে নিয়ে শুয়ে আছেন। তার পাশেই বসে আছেন আরও একজন।
স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে, নীরব ফরাজী ও তার ভাইদের নেতৃত্বে চরে একটি সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত হতো। মেঘনা নদী ও চর মোজাম্মেল কেন্দ্রিক নৈরাজ্য, চাঁদাবাজি এবং ত্রাস সৃষ্টি করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। অবৈধ অস্ত্রের মুখে সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পেত না।
অস্ত্রধারী এই চক্রের নৃশংসতার শিকার হওয়া এক নারী সম্প্রতি তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সালে ওই নারী, তার দুই কন্যা ও বৃদ্ধা মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। চর মোজাম্মেল এলাকার ‘ভুট্টু নেতার ব্লকে’ টানা চার দিন তাদের আটকে রাখা হয়। ভুক্তভোগীর দাবি, প্রতি রাতে নীরব ও তার সহযোগীরা তাকে এবং তার শিশু কন্যাকে আলাদা কক্ষে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করত।
পরবর্তীকালে প্রশাসনের সহায়তায় তারা উদ্ধার হলেও প্রভাবশালীদের চাপে মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। এর প্রতিবাদ করায় ২০২২ সালে ওই নারীর ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও গবাদিপশু লুট করে তাকে সপরিবারে চর থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ঐ নারীকে আশ্রয় নিতে হয় বাবার বাড়ি লক্ষ্মীপুরে।
এই বর্বরোচিত ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরায় পরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন তজুমদ্দিন রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাদির হোসেন রাহিম। অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত নীরবের ভাই আলাউদ্দিন ফরাজীর নেতৃত্বে একটি কিশোর গ্যাং চক্র সাংবাদিক রাহিমের ছবি বিকৃত করে এবং কুরুচিপূর্ণ তথ্য ছড়িয়ে সাইবার হামলা চালাচ্ছে। সংবাদ প্রকাশে বাধা দিতেই এই অপকৌশল বেছে নেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।
প্রধান অভিযুক্ত নীরব তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও, প্রকাশ্যে আসা পিস্তল হাতে তার ভাইয়ের ছবি নিয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
তজুমদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, বিষয়গুলো পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে। তদন্তসাপেক্ষে এই চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে অবৈধ অস্ত্রধারী ও ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে তজুমদ্দিনের সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

