মাথায় ও শরীরে কাফনের কাপড় বেঁধে পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া ছাত্রদলের সাবেক এক নেতাকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। জোবায়ের হোসেন বাপ্পী ওরফে ‘হুপ বাপ্পী’র এ ঘটনায় উপজেলাজুড়ে মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও হত্যার হুমকির অভিযোগের পরও মামলা না দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিকেলে বিক্ষুব্ধ জনতা ঈশ্বরদী থানার প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে ঘেরাও করে। এ সময় পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার খোন্দকার শামিম হোসেন থানার মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। একই সময়ে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বাপ্পীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানায়।
এর আগে, গত সোমবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঈশ্বরদী শহর ও থানার প্রধান ফটক এলাকায় এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগে বাপ্পীর লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্রটি জব্দ করে তাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। রাত দুটার দিকে তাকে ও আরো চারজনকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে কোনো মামলা না থাকায় রাত সাড়ে ৩টার দিকে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ডিবি।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার বিকালে মাথা ও শরীরে সাদা কাফনের কাপড় জড়িয়ে লাইসেন্স করা শটগান হাতে শহরে বের হন বাপ্পী। শহরের প্রধান সড়কের তিন কিলোমিটার পর্যন্ত মহড়া দিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে দাশুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সামাদ সুলভ মালিথাসহ কয়েকজন ছিলেন। তারা শহরের রেলগেট এলাকায় পৌঁছালে বাপ্পী আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য-সচিব মেহেদী হাসানকে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় তার সহযোগীরা পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বাপ্পী অস্ত্রহাতে ঈশ্বরদী থানায় প্রবেশ করলে থানার সামনেও উত্তেজনা দেখা দেয়।
হত্যার হুমকি পাওয়া মেহেদী হাসান ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর সমর্থকরা থানার প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হন। তারা বাপ্পী ও সুলভ মালিথাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে স্লোগান দেন। এ সময় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব, দাশুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম তুহিন ও সুলভ মালিথার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
মেহেদী হাসান বলেন, ‘প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে বাপ্পী পুরো শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে প্রতিপক্ষের প্রাণনাশের উদ্দেশ্যেই এ ধরনের অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমাকে হত্যার হুমকি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে বাপ্পী ও সুলভ মালিথার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে বাপ্পীকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে জানতে পেরেছি, ডিবি মুচলেকা নিয়ে তাকে সহযোগীদেরসহ ছেড়ে দিয়েছে।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, বাপ্পী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। দলীয় গ্রুপিং ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে সেই বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে।
তবে বাপ্পীর পক্ষের দাবি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ জানাতেই তিনি মাথায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে প্রকাশ্যে লাইসেন্স করা অস্ত্র নিয়ে থানার সামনে অবস্থান করেছিলেন। কাউকে ভয় দেখানো তার উদ্দেশ্য ছিল না।
ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার সরকার বলেন, জোবায়ের হোসেন বাপ্পীর কাছে থাকা অস্ত্রটি তার লাইসেন্স করা। তবে তিনি আইন ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে অস্ত্রহাতে শহরে মহড়া দিয়েছেন। এতে জনসাধারণের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে অস্ত্রটি জব্দ করা হয়েছে। অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইনচার্জ রাশিদুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাতে বাপ্পীসহ পাঁচজনকে কোনো মামলা ছাড়াই হেফাজতের জন্য আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মামলা না থাকায় মুচলেকা নিয়ে রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-6364ca.jpg)