কুড়িগ্রামের পলাশ চন্দ্র রায় প্রাইমারি থেকে শুরু করে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত আসতে তাকে পার করতে হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। খাবারের অভাবের কাছে বারবার হেরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে তার শিক্ষাজীবন। আর ১০টা পরিবারের ছেলেমেয়েদের মতো তার ভাগ্যে জোটেনি টিফিন, প্রাইভেট কিংবা নতুন জামাকাপড়। পরিবারের অস্বচ্ছতা আর অভাব-অনটন তার স্বপ্নকে বারবার নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে পলাশ বাবার সঙ্গে নেমে পড়েছেন জীবনযুদ্ধে, তৈরি করেছেন জীবনের নতুন গল্প। অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেও এবারের এসএসসি পরীক্ষায় তার জিপিএ ৫ অর্জন।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের পূর্ব দিলাম গ্ৰামের সুধাংশু চন্দ্র রায়ের ছেলে পলাশ এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বড়ভিটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে। এই বিদ্যালয় থেকে এবারে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকৃত ৭২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয়েছেন ৫৫ জন, জিপিএ ৫ পেয়েছেন ১৩ জন। এসব জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের মধ্যে একজনের ফলাফল সবার কাছে অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর মনে হয়েছে । সে হলো পলাশ। দারিদ্র্যতার চরম কশাঘাতে নিষ্পেষিত পরিবারের সদস্য পলাশের ভাগ্যে যখন দুবেলা দুমুঠো খাবার জুটত না, তখন তার এই ফলাফল সত্যি আর ১০জন শিক্ষার্থীর জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
পলাশের বাবা সুধাংশু চন্দ্র রায়ের চাষাবাদের জন্য নিজস্ব কোনো জমাজমি নেই। তার ওপর রোগ-শোক যেন ছাঁয়ার মতো নিত্যসঙ্গী। মাত্র ৫ শতক জমিতে টিনের ঝুপড়ি ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পেতেছেন ছয়জনের সংসার। একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসেবে দিনমজুরি করে খেয়ে না খেয়ে চলে তার পরিবার। বাবার হাড়ভাঙা পরিশ্রম দেখে বাধ্য হয়ে পলাশও বাবার সঙ্গে শুরু করে অন্যের জমিতে দিনমজুর কাজ। উদ্দেশ্য শুধু নিজের পড়ালেখার পাশাপাশি সংসারে সামান্য সুখের জোগান দেওয়া। সংসারের এমন পরিস্থিতিতে পলাশের ভালো ফলাফলে পরিবারে সাময়িকের জন্য খুশির আমেজ বিরাজ করলেও তার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
পলাশ বলেন, আমি বাবা-মা আর শিক্ষকদের সাহায্য সহযোগিতায় অনেক কষ্টের মাঝে এতদিন পড়ালেখা করেছি। সেই প্রতিদান আমি পেয়েছি। আমার স্বপ্ন আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চাই। আমি চাই লেখাপড়া শেষ করে মানুষের সেবা করতে। সবাই আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন।
ভালো রেজাল্ট করায়, পলাশের বাবা সুধাংশু চন্দ্র ও মা পূর্ণিমা রানির মাঝে উচ্ছলতা দেখা গেলেও ছেলের উচ্চশিক্ষা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন তারা।
পলাশের মা পূর্ণিমা রানি বলেন, একদিকে সংসারের অভাব আর অন্যদিকে ছেলের পড়ালেখা, দুই দিক সামাল দিতে খুব কষ্ট হয়েছে। সামনে কলেজে ভর্তি করে দিতে হবে। সহযোগিতা না পেলে ছেলেটার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তার স্বপ পূরণ হবে না এই ভয়ে বুকটা ফেটে যায়।
বড়ভিটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরীফ উদ্দিন বলেন, পলাশ আমাদের বিদ্যালয়ের অত্যন্ত গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থী। আমরা শিক্ষকরা তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের মাধ্যমে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

