নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নিমার্ণে রডের বদলে তার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক প্রকৌশলীকে বদলিসহ দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্রিজটির নির্মাণকাজের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম তাদের চোখে ধরা পড়ে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পর কিছু কাজ সংশোধন করা হয়।
রাতের অন্ধকারে ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে জিআই তার এবং নিম্নমানের সিমেন্ট দিয়ে কোনোমতে কাজ করেছেন ঠিকাদার। দিনে এসব স্ল্যাবে পথচারীদের পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ভেঙে পড়ে। একই ঘটনা ঘটে সেতুর রেলিংয়ের ক্ষেত্রেও।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল বলেন, 'ব্রিজটির কাজ শুরু থেকেই অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে। আমরা এসব বিষয়ে বারবার এলজিইডিতে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছি। সরাসরি ঠিকাদারের লোকদেরকে অনিয়ম দেখিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এরপরও তারা কাজটা ভালোভাবে না করে রডের স্থলে তার দিয়ে কোনো রকমে কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করছে।'
আওয়ামীলীগের সময়ে তাদের দলীয় ঠিকাদার সেনবাগ পৌর আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহজাহান কাজটি পান। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ঠিকাদার শাহজাহান কাজের স্থলে আসেননি। বর্তমানে তার চাচাতো ভাই বিএনপি নেতা ফরহাদকে দিয়ে কাজটি পরিচালনা করছেন।
স্থানীয়রা জানান, ব্রিজের পাইলিং থেকেই নানা অনিয়ম চোখে পড়ে। আমরা একাধিকবার এসব অনিয়ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছি। তারা দিনে কাজ করে না, রাতের অন্ধকারে কাজ করে।
নোয়াখালী এলজিইডি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট থেকে সাহেবেরহাট ও হাসানহাট হয়ে মাইজদী আঞ্চলিক মহাসড়কে ৪৯ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ব্রিজের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর।
শুরুতে মেসার্স হক ট্রেডার্সের নামে সেনবাগের আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহজাহান কাজটি পেলেও গত বছরের ৫ আগস্টের পর কাজটি হাতবদল হয়ে নতুন করে বিএনপি নেতা মো. ফরহাদ (ঠিকাদার ফরহাদ) পান।
এ বিষয়ে এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, 'নির্মাণকাজ সরেজমিন পরিদর্শন করেন এলজিইডির সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা। এ সময় দেখা যায় সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবের কাজ নিম্নমানের, যা নকশা ও স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত। একই সঙ্গে রেলিংয়ের রডের কাজও নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়।'
তিনি আরো বলেন, 'আমি নিজে সরেজমিনে ব্রিজের ফুটপাতের নিম্নমানের কাজ দেখে ঠিকাদারের লোকজনকে দ্রুত স্ল্যাবগুলো ভেঙে অপসারণ করতে বলে আসি। সেই আলোকে বুধবার আমাদের লোকজনের উপস্থিতিতেই ফুটপাতের স্ল্যাবগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছিল। এ সময় উৎসুক লোকজন মোবাইলে সে দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।'
নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল বলেন, এর মধ্যে স্ল্যাব এবং রেলিংয়ের যেসব জায়গায় নিম্নমানের কাজ হয়েছে, সেগুলো সব ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক ট্রেডার্সকে দেওয়া চিঠিতে নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণকাজের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে আগামী সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, 'এ ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক প্রকৌশলীকে বদলিসহ দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।'
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, 'কাজটি হক ট্রেডার্স পেলেও আমরা করছি না। আমাদের লাইসেন্সে সেনবাগের আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান কাজটি করছেন। বর্তমানে শাহজাহান তার চাচাতো ভাই বিএনপি নেতা ফরহাদকে দিয়ে কাজটি দেখভাল করাচ্ছেন।'
এ ব্যাপারে ঠিকাদার শাহজাহানকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে মো. ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেন, 'ব্রিজের কাজটি আমরা শুরু থেকেই ভালোভাবে করে আসছি। সম্প্রতি আমার অজান্তে ব্রিজের ফুটপাত ও রেলিংয়ের কাজে কিছু ত্রুটি ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলজিইডির প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে যেসব অংশে কাজ ভালো হয়নি, তা ভেঙে ফেলা হয়েছে।'
এ ঘটনায় বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, 'ঠিকাদার অনিয়মিত কাজ করতেন। আমাদের অগোচরে সে এই অনিয়ম করে ফেলে। ব্রিজটির কাজে অনিয়মের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে যেসব জায়গায় কাজের মান খারাপ হয়েছে, সেগুলো ভেঙে অপসারণ করেছি।'
এছাড়া উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. মহিন উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

