বাঁশখালীতে ভয়াবহ বন্যায় সাত খাতে অন্তত ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দুর্যোগে সর্বস্ব হারানো মানুষের প্রধান দাবি এখন ত্রাণ নয়, বরং টেকসই পুনর্বাসন এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই বা একটি ঘর।
বাঁশখালীর খানখানাবাদ, গুনাগরি, বাহারছড়া, ছনুয়া, পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, চাম্বল, গন্ডামারা, জলদী, সরল, সাধনপুর, পুকুরিয়া ও বৈলছড়ির কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের একটাই দাবি, শুধু সাময়িক ত্রাণ নয়, তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন ও বাড়িঘর নির্মাণ করে দেওয়া হোক । এদিকে সরকারিভাবে বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু ত্রাণ দেওয়া নয়, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত ও সড়ক-কালভার্ট সংস্কার করে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা। বাঁশখালীতে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, ঘর নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেছে। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা প্রস্তুত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা এখন স্থানীয় প্রশাসন ও সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রমতে, বন্যায় পানিতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, ঢলে ভেসে মারা গেছে দুজন এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আসবাহার বেগম ও মরিয়ম বেগম নামে দুই নারীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সাপের দংশনে ৩৫ জনসহ বিভিন্নভাবে আহত হয়েছে আরো ২৪ জন।
ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শনিবার পর্যন্ত ১০ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার ও ১৭৮ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ১ লাখ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০ হাইজিন বক্স, ১৫৬টি জেরিকেন পানি ও পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে। মজুত রাখা হয়েছে আরো ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং নতুন বরাদ্দ পাওয়া ৫০ টন চাল।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তৌসিব উদ্দিন জানান, ১৪টি ইউনিয়নে ৪ হাজার ২০০ পুকুর এবং ১৮৮০.৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩১০টি চিংড়ি ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৫ হাজার খামারির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুয়েল মজুমদার জানান, ঢলের পানিতে ১ হাজার ২৭০টি গবাদি পশুর খামার ও ৭৪০টি পোলট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার জানান, ১ হাজার ১০০ হেক্টরের গ্রীষ্মকালীন সবজি, ২ হাজার ২৩৫ হেক্টরের আউশ, ৫৫ হেক্টরের আমন বীজতলা, ২০ হেক্টরের পেঁপে, ২০ হেক্টরের আদা, ৬.৫ হেক্টরের হলুদ এবং ১০ হেক্টরের পানের বরজসহ মোট ৩ হাজার ৪৪৬.৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২৬ হাজার ৮০০ কৃষকের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।
উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল জানান, ১৪৯.৮৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অন্তত ২৩টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে বড় ভাঙন ১১টি। গন্ডামারা ইউনিয়নে ৫০০ মিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭০টি স্লুইসগেটের মধ্যে ১১টি সম্পূর্ণ অচল এবং ৪৬টি ঝুঁকিপূর্ণ। নদী ও অভ্যন্তরীণ বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ কোটি টাকা।
এলজিইডি (অবকাঠামো) : উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইফরাদ বিন মুনির জানান, ৫৮টি রাস্তা, ৬০টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বমোট ১০৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে ১৫ কোটি ৭ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। শেখেরখীল, বাহারছড়া ও গন্ডামারা এলাকায় পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।
বন্যায় উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ৫৪টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ১১ হাজার ১১০টি বসতবাড়ি প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেন, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিনে ৪১২ মিলিমিটার অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এই ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, অসাধু সিন্ডিকেট মৎস্য প্রকল্পের আড়ালে সরকারি স্লুইসগেটগুলো বন্ধ রাখায় পানি জমে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয়েছে। এছাড়া গত ১৭ বছর জলকদর খাল খনন না করায় এই বিপর্যয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা ২০টি স্থানে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছি এবং অকেজো স্লুইসগেট সংস্কারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

