কুমিল্লায় হারিয়ে যাচ্ছে পান চাষ

কুমিল্লায় হারিয়ে যাচ্ছে পান চাষ

এক সময় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া ও দেবিদ্বার উপজেলা ছিল পান চাষের জন্য সুপরিচিত। উপজেলার চান্দলা, উত্তর চান্দলা, মাধবপুর ও মকিমপুর এলাকায় শত শত পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্যের অভাব ও সরকারি সহায়তার সংকটে সেই ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। দুই দশক আগে যেখানে এসব এলাকায় প্রায় ২৫০টি পানবরজ ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫টিতে।

সরেজমিনে উত্তর চান্দলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এখনো কয়েকটি বরজে সবুজ পানের লতা দুলছে। বাইরে থেকে বরজগুলো প্রাণবন্ত মনে হলেও ভেতরে রয়েছে চাষিদের দীর্ঘদিনের লোকসান আর টিকে থাকার সংগ্রামের গল্প। অনেকেই বরজ ভেঙে সেখানে কাঠবাগান, শাকসবজি চাষ কিংবা গরুর খামার গড়ে তুলেছেন।

বিজ্ঞাপন

উত্তর চান্দলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা আরুতি রানী পাল (৭০) প্রায় ৫০ বছর ধরে পান চাষ করছেন। স্বামী মারা যাওয়ার ২৩ বছর পরও তিনি পারিবারিক এই পেশা ছাড়েননি। তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই পান চাষ করছি। স্বামী মারা যাওয়ার পরও এ পেশা ধরে রেখেছি। তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে কোনোরকমে সংসার চলছে। এখন সার ও কীটনাশকের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ থাকে না।

তিনি জানান, নতুন করে ৩০ শতক জমিতে একটি বরজ করতে প্রায় ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিকালে পান সংগ্রহ করে রাখা হয়, সকালে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নিয়ে যান। সাধারণ সময়ে ৮০টি পান নিয়ে এক বিড়া ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও ফাল্গুন-চৈত্র মাসে একই বিড়ার দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ওঠে।

বাপ-দাদার আমল থেকে পান চাষ করে আসা চাষি শুন পাল বলেন, লাভ কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম আর এ পেশায় থাকতে চায় না। ২০-২৫ বছর আগে এলাকায় প্রায় ২৫০টি বরজ ছিল, এখন হাতেগোনা কয়েকজন চাষি রয়েছেন। আগের মতো বাইরের ব্যবসায়ীরাও আসেন না। স্থানীয় কয়েকজন দোকানির কাছেই পান বিক্রি করতে হয়, ফলে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, আমরা ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পান চাষ ধরে রেখেছি। কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্ম এ পেশায় থাকবে না। রোগবালাই দেখা দিলে কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও পাওয়া যায় না।

কুমিল্লা শহরের পান ব্যবসায়ী উত্তম কুমার বলেন, এক সময় চান্দলা ও মাধবপুরের পান দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। এখন বরজের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীদের আনাগোনাও কমে গেছে। এতে বাজার সংকুচিত হয়েছে এবং চাষিরা কাঙ্ক্ষিত দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মতিন আমার দেশকে বলেন, একই জমিতে দীর্ঘদিন পান চাষ করলে ফলন কমে যেতে পারে। জমি পরিবর্তন করে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। উন্নত জাতের লতা বা চারা না পাওয়াও ফলন কমার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, পান মূলত পারিবারিকভাবে চাষ করা হয়। এক সময় এই পান রপ্তানিও হতো, বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। তবে উপজেলায় বর্তমানে কত জমিতে পান চাষ হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব কৃষি বিভাগের কাছে নেই। কোনো চাষি যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মিজানুর রহমান আমার দেশকে বলেন, কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি পান চাষ হয় দেবিদ্বার ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায়। ভালো দাম না পাওয়ায় চাষিরা ধীরে ধীরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এছাড়া মাটির অম্লত্ব (এসিডিটি) বেড়ে যাওয়াও পান চাষ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। চাষিদের দাবি, পান চাষকে টিকিয়ে রাখতে শুধু পরামর্শ নয়, প্রয়োজন উন্নত জাতের চারা, প্রশিক্ষণ, রোগবালাই দমনে কার্যকর কৃষি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা।

একইসঙ্গে স্থানীয় পান দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ না নিলে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী পান চাষ এক সময় ইতিহাসে পরিণত হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন