চট্টগ্রাম সংঘর্ষ

পুলিশ ও সাংবাদিকসহ আহত ৩, পুলিশের গাড়িতে আগুন

পুলিশের গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ

চট্টগ্রাম ব্যুরো

পুলিশ ও সাংবাদিকসহ আহত ৩, পুলিশের গাড়িতে আগুন
ছবি: সংগৃহীত।

চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে টানা ছয় ঘণ্টা উত্তেজনা, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, পুলিশের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উত্তেজিত জনতা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দিনশেষে গভীর রাতে পুলিশ অভিযুক্ত মো. মনিরকে হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোডের ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামের একটি ভবনে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, তিন বছরের শিশুটির মা পোশাক কারখানায় কাজ করেন এবং বাবা রিকশাচালক। দুপুরে শিশুটি বাসায় ঘুমিয়ে ছিল। পাশের দোকানের কর্মচারী, ৩২ বছর বয়সী মো. মনির শিশুটিকে একা পেয়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় দেখার পর সন্দেহ হলে প্রতিবেশীরা মনিরকে ধরে নিকটবর্তী একটি মাদ্রাসার গেটের ভেতরে তালাবদ্ধ করে রাখেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা প্রথমে বুঝতেই পারিনি। পরে শিশুটির কান্না শুনে সন্দেহ হয়। মনিরকে ধরে মাদ্রাসায় আটকে রাখি।”

জনতার দাবি: ‘ধর্ষককে আমাদের হাতে দেন, আমরা মেরে ফেলব’

বিকেল ৪টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু জনতা অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। শত শত মানুষ পুলিশকে ঘিরে ধরে। ক্ষুব্ধ জনতা চিৎকার করতে থাকে, “ধর্ষককে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা মেরে ফেলব। বাংলাদেশের আইনে বিচার হয় না।”

তাঁরা দাবি করেন, বহু ধর্ষণ মামলার বিচার হয়নি, তাই তাঁরা নিজেরাই ‘বিচার’ করবেন।

পুলিশ যখন অভিযুক্তকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করে, তখন জনতা বাধা দেয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। একপর্যায়ে র‍্যাব সদস্যরাও ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।

রাকিব হাসান নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “পুলিশ আসামিকে নিতে চাইছিল, কিন্তু এলাকাবাসী ছাড়ছে না। পুলিশ পিছু হটলে জনতা এগিয়ে আসছে, এগোলেই আবার উত্তেজনা।”

সাংবাদিকদের ওপর গুলি—দুজন গুলিবিদ্ধ

উত্তেজনার সময় ঘটনাস্থলে ফেসবুক লাইভ করা অবস্থায় ‘চট্টগ্রাম প্রতিদিন’-এর সাংবাদিক মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান গুলিবিদ্ধ হন।

সংবাদমাধ্যমটির প্রকাশক আয়ান শর্মা বলেন, “লাইভ চলাকালে হঠাৎ দেখি গুলি লাগল। মামুনের কোমরে গুলি, নোবেলের হাতে ও পায়ে গুলি লাগে। আমরা দ্রুত তাঁদের নিয়ে হাসপাতালে যাই।”

প্রথমে তাঁদের চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, নোবেলের আঘাত কিছুটা জটিল হলেও দুজনই চিকিৎসাধীন।

পুলিশ জানিয়েছে, জনতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করলে তারা প্রথমে সাউন্ড গ্রেনেড, পরে টিয়ারশেল এবং শেষে গুলি ছোড়ে। একজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁকেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

বাকলিয়ার বাসিন্দা রোকসানা আক্তার বলেন, “এলাকা পুরো যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গিয়েছিল—চারদিকে ধোঁয়া আর চিৎকার।”

রাত ১০টার দিকে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। অভিযুক্তকে নেওয়ার সময় জনতা পুলিশের একটি পিকআপ ঘিরে ধরে। উত্তেজিত কয়েকজন যুবক হঠাৎ গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশ দ্রুত সরে গিয়ে অবস্থান নেয়। আগুনে গাড়ির সামনের অংশ পুড়ে যায়।

৬ ঘণ্টা অস্থিরতার পর পুলিশের হেফাজতে অভিযুক্ত মনির

রাত ১০টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে গভীর রাতে অভিযুক্ত মনিরকে হেফাজতে নেওয়া হয়। বাকলিয়া থানার ওসি মো. সোলাইমান বলেন, “প্রায় ৬ ঘণ্টা চেষ্টা করার পর আমরা আসামিকে হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়েছি। জনতা খুবই উত্তেজিত ছিল। আইন নিজের হাতে নেওয়া যাবে না—এ কথা আমরা বারবার বলেছি।”

তিনি আরও বলেন, “শিশুটিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মামলা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। মনিরকে মেডিকেল টেস্টের পর থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”

রাতেও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করে। মোড়ে মোড়ে পুলিশ ও র‍্যাবের টহল জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

একজন স্থানীয় নারী বলেন, “এমন ঘটনা আর কখনো দেখিনি। শিশুটা বাঁচুক—বিচার হোক।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন