নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, আটক ৫ শতাধিক

নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, আটক ৫ শতাধিক

নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদী ও বেগমগঞ্জের চৌমুহনীসহ জেলার প্রতিটি উপজেলা ও পৌর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য লক্ষণীয় হারে বেড়েছে। এটি নির্মূলে জেলাজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। গত পাঁচ দিনে প্রায় পাঁচ শ কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

জেলা শহর, বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকা, বিনোদন কেন্দ্র, বিভিন্ন রাস্তার গলি, পৌর পার্ক, স্কুল-কলেজ ও হাটবাজারসংলগ্ন এলাকা, গ্রামাঞ্চলের রাস্তার মোড়, পোল, কালভার্ট, ব্রিজের ওপর, চায়ের দোকান, গ্রামের পরিত্যক্ত বাড়ি ও বাগানবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোররা আড্ডায় মেটে ওঠে। স্কুল ছুটির পর বিদ্যালয়ের মাঠ ও আঙিনাতেও তাদের আড্ডা জমে ওঠে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এনটিএস (NTS), বিটিআর (BTR), কেটিজি (KTG)সহ বিভিন্ন নামে অর্ধশত গ্রুপ রয়েছে তাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোররা এসব গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চুরি-ছিনতাই, সংঘর্ষ, ইভ টিজিং ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীর নয়টি উপজেলায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপ রয়েছে। নোয়াখালী পৌরসভা এলাকায় রয়েছে প্রায় ২৫টি গ্রুপ। আবার এসব গ্রুপের অধীনে ছোট ছোট উপদল রয়েছে। এদের নিজস্ব নেটওয়ার্কও রয়েছে।

নোয়াখালী পৌর এলাকায় মাইজদী হাউজিং এলাকা, পৌর পার্ক, হাসপাতাল রোড, মুরগির ফার্ম, জহিরুল হক মিয়ার গ্যারেজ, মাইজদী কোর্ট স্টেশন, নাপিতের পোল, খন্দকারপাড়া, বচিরার দোকান, মাস্টারপাড়া, মাইজদী বাজার ও আশপাশের এলাকা, মাইজদী স্টেশন রোড, মাইজদী স্টেশন, দত্ত বাড়ির মোড়, দত্তেরহাট মোরগহাটা, সোনাপুর কাঠপট্টি, বিসিক শিল্পাঞ্চলের ব্রিজ এলাকা, কৃষ্ণরামপুর বোর্ড অফিস এলাকা, পূর্ব কাদিরহানিফ ইসমাইলের মোড়, হরিনারায়ণপুর ও কালিতারা বাজার এলাকা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নোয়খালীতে বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং রয়েছে। কিছু গ্রুপ প্রকাশ্যে রয়েছে, আবার কিছু গ্রুপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর গ্যাং গ্রুপগুলোর সদস্যদের একটি অংশ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, ছিনতাই, ইভ টিজিং ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ সব অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও দৌরাত্ম্য নির্মূলে গত পাঁচ দিন ধরে পুলিশ জেলাব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। ধারাবাহিক এই অভিযানে ৪৬৯ জন সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের মধ্যে অধিকাংশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় তাদেরকে অভিভাবকদের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে অথবা ইতিবাচক মামলা রয়েছে, তাদেরকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

কিশোর গ্যাং সদস্যরা হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ইভ টিজিং, মাদক কারবার, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে আসছে। গত এক বছরে নোয়াখালীতে প্রায় হাফ ডজন খুনের ঘটনা ঘটেছে।

নোয়াখালী কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন বলেন, যেসব কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের আটক রাখা জরুরি। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তাদের অভিভাবককে ডেকে এনে কাউন্সিলিং ও আইনি পরামর্শ দিয়ে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এ থেকে প্রতিকারের জন্য পিতা-মাতা, পরিবার ও সমাজ—সকলকে সচেতন হতে হবে এবং আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো কিশোর হঠাৎ করে অপরাধী হয়ে ওঠে না। পরিবার থেকে দূরত্ব, খারাপ সঙ্গ, মাদকের সহজলভ্যতা, গ্যাংয়ের প্রভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু নেতিবাচক দিক তাকে ধীরে ধীরে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে।

নোয়াখালী পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সমাজে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা জেলার বিভিন্ন থানায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক কিশোরকে আটক করেছি। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি, তাদের জেলহাজতে পাঠিয়েছি

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন