বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় চট্টগ্রামে দায়ের হওয়া মামলাগুলো থেকে একে একে বাদ পড়ছেন আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩-ক ধারায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো আসামির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে এই ধারার প্রয়োগ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, এসব আবেদনের ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ হচ্ছে না। অর্থ ও প্রভাবের কারণে কোনো কোনো আবেদন দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির উপদেষ্টা ও বোয়ালখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহেদুল হক। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় বাকলিয়া ও খুলশী থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। তবে এসব মামলায় তার সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
এ তালিকায় আছে বোয়ালখালীর বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এনামুল হকের নামও। বাকলিয়া থানায় দায়ের করা আরেকটি মামলা থেকে তাকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
জাহেদুল হকের অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির ক্রাইম বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) রইছ উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, মামলায় কেউ আসামি হলে পুলিশ কমিশনার সংশ্লিষ্ট থানার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে চিঠি দিয়ে ওই ব্যক্তির অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা জানতে চান। তদন্ত কর্মকর্তা চিঠির মাধ্যমে মতামত জানান। মতামতে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে চার্জশিট দেওয়া হয়। আর সম্পৃক্ততা না থাকলে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
জাহেদুল হকের বিষয়ে রইছ উদ্দিন বলেন, পুলিশ কমিশনার সংশ্লিষ্ট থানার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলায় তার সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা জানতে চেয়েছেন। তদন্তে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
প্রায় ৫০ জন বাদ
ঠিক কতজনকে ১৭৩-ক ধারায় মামলা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তা জানতে নগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, এ-সংক্রান্ত তথ্য ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কাছে রয়েছে।
এ বিষয়ে রইছ উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, সম্পৃক্ততা না থাকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কতজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কোন কোন মামলায় তাদের নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, ১৭৩-ক ধারায় অব্যাহতির আবেদন পুলিশ কমিশনারের দপ্তর থেকে ডিসি ক্রাইমের কাছে আসার পর সংশ্লিষ্ট জোনের ডিসি ও থানার ওসির কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টিতে পুলিশ কমিশনারের ‘ইন্টারেস্ট’ রয়েছে বলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জানানো হয় বলে অভিযোগ তাদের। তবে কর্মকর্তাদেরই কেউ কেউ বলছেন, পুলিশ কমিশনার ব্যক্তিগতভাবে এসব বিষয়ে অবহিত নাও থাকতে পারেন। তার নাম ব্যবহার করে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও তদন্তের বিষয় বলে তারা মনে করছেন।
এ বিষয়ে জানতে নগর পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
শত শত আবেদন, প্রশ্ন বাছাই নিয়ে
সিএমপি সূত্রের দাবি, ১৭৩-ক ধারায় অব্যাহতির জন্য শত শত আবেদন জমা পড়েছে। তবে সব আবেদন একই গতিতে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। কোনো কোনো আবেদন দীর্ঘদিন ডিসি ক্রাইমের দপ্তরে পড়ে থাকলেও কিছু আবেদন দ্রুত সংশ্লিষ্ট জোন ও থানায় পাঠিয়ে প্রতিবেদন চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, যেসব আবেদনের ক্ষেত্রে আর্থিক সমঝোতা হচ্ছে, সেগুলোই দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩-ক ধারায় তদন্ত তদারককারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিতে পারেন। কোনো আসামির বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে আদালত তাকে তদন্ত চলাকালীন অব্যাহতি দিতে পারে। তবে এই অব্যাহতি মানে চূড়ান্ত খালাস নয়। পরবর্তী তদন্তে নতুন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ওই ব্যক্তির নাম আবার অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামে ১৭৩-ক ধারায় যাদের নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো—তদন্তে কী প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কেন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি এবং একই মামলার অন্য আসামিদের ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন, পুলিশ কমিশনারের চিঠি এবং আদালতের আদেশ পর্যালোচনা করলে।
আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা যদি মামলা থেকে বাদ পড়ে থাকেন, তাহলে এখানে মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বিশেষ করে তদন্ত কর্মকর্তাদের পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। এতে তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



