কুমিল্লা নগরীতে স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে বাইরে আড্ডায় সময় কাটানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এতে তাদের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেকেই ধীরে ধীরে মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নগরীর গোমতী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ক্যাফে ও রিসোর্ট এখন শিক্ষার্থীদের অন্যতম আড্ডাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থানে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিনা বাধায় শিক্ষার্থীরা সময় কাটাচ্ছে।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার গোমতী পাড়ের কয়েকটি রিসোর্ট ঘুরে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা সেখানে আড্ডায় মেতে রয়েছে। কেউ গানের সঙ্গে নাচানাচি করে রিলস তৈরি করছে, আবার কেউ টিকটক ভিডিও বানাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, নগরীর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা সরকারি কলেজ ও ভাষাসৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বেশি আসছে এসব স্থানে।
গোমতীপাড়ের ‘গোমতী ক্যাফে ৩৫০০’ নামের একটি স্পটে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কয়েকজন শিক্ষার্থী দলবদ্ধভাবে নাচানাচি করে ভিডিও ধারণ করছিল, যাদের মধ্যে ছেলেমেয়ে উভয়েই ছিল। এ সময় আমার দেশের কুমিল্লা প্রতিনিধি ওই দৃশ্য ধারণ করতে গেলে কয়েকজন ছেলে শিক্ষার্থী তেড়ে আসে। তারা প্রতিনিধিকে ভিডিও ধারণের কারণ জানতে চায় এবং ইতোমধ্যে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার জন্য চাপ দেয়। একপর্যায়ে প্রতিনিধিকে হুমকিও দেওয়া হয়। পরে শিক্ষার্থীদের গায়ে ভাষাসৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ের পোশাক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষককে ফোন করা হলে তারা সরে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুমিল্লার বিবির বাজার স্থলবন্দর থেকে পালপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত গোমতী নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ছোট-বড় চা ও কফির দোকান, ক্যাফে এবং রেস্তোরাঁ। অভিযোগ রয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা দখল করে অবৈধভাবে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা এসব ক্যাফে থেকে নিয়মিত মাসোহারা পান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সেখানে আড্ডা দিয়ে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। অভিভাবকেরা মনে করছেন, তাদের সন্তানরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রয়েছে, অথচ অনেকেই জানেন না—তারা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কোথায় সময় কাটাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু যুবক সেখানে মাদক সেবন করতেও আসে। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ বাড়লেও ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না।
গোমতী পাড়ের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম আমার দেশ-কে বলেন, ‘প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী বাইক নিয়ে গোমতী নদীর পাড়ে আসে। তারা কলেজে না গিয়ে বিভিন্ন ক্যাফেতে আড্ডা দেয়। কিন্তু লাভের আশায় ক্যাফে কর্তৃপক্ষ তাদের বাধা দেয় না। আমরা কিছু বললেই উল্টো হুমকি-ধমকি দেয়। প্রশাসনেরও তেমন নজরদারি নেই। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।’
ভাষা সৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কলেজে গিয়ে হাজিরা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নদীর পাড়ে চলে এসেছি। প্রায়ই এখানে ঘুরতে আসি। আমাদের সঙ্গে মেয়েরাও আসে।
ক্যাফেগুলোয় শিক্ষার্থীদের প্রবেশে কোনো বাধা দেওয়া হয় কি না জানতে চাইলে গোমতী ক্যাফে ৩৫০০-এর ম্যানেজার জামাল হোসেন বলেন, আমরা বাধা দিলে উল্টো আমাদের মারধরের ভয় দেখায়। এসপি ও ওসি স্যার মাঝেমধ্যে এসে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে বলেছেন। কিন্তু তারা আমাদের কথা শোনে না। প্রতিদিন দলবেঁধে আসে। আমরা আবার সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেব—কলেজ টাইমে কোনো শিক্ষার্থী প্রবেশ করতে পারবে না।
ভাষা সৈনিক অজিত গুহ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, এর আগেও কুমিল্লার বিভিন্ন পার্ক থেকে শিক্ষার্থীদের ধরে এনে অভিভাবকদের ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, তবে অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে। সন্তানরা কলেজে আসার নামে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকরা শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন। আমাদের শিক্ষকরা এ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন।
কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার আমার দেশকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস চলাকালীন গোমতী নদীর পাড়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়টি আমি শুনেছি । এর আগেও একাধিকবার অভিযান করা হয়েছে। নদীর পাড়ে শিক্ষার্থীরা ঘোরাঘুরি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে আসে কি না; তা তদারকির জন্য আমরা নজরদারি বাড়াচ্ছি ।
অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ক্যাফে ও রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন—এ প্রশ্নের জবাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে। আমরা শিগগিরই মাইকিং করব। নদীর পাড়ের ৩০০ ফুটের মধ্যে কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকতে পারবে না।
সচেতন নাগরিক সমাজের আশঙ্কা, গোমতী নদীর পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ চালু থাকলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আরো বেশি মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ফিরছেন একের পর এক পাকিস্তানি ব্যাটার