এক সময় দেশের আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের ৭৫-৮০ শতাংশ বেচাকেনা হতো চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। দুই শতাব্দীর বেশি পুরোনো এই বাজারে চাল, ডাল, গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের ব্যবসা ছিল মূলত আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বাজারের কাঠামো। আমদানি, পরিশোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিজস্ব বিতরণব্যবস্থা গড়ে তুলে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ভোগ্যপণ্যের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছে। অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক আস্থার সংকটে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন খাতুনগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান ছয় নিত্যপণ্যের আমদানিতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অংশ দুই দশকে ৬২ শতাংশ থেকে কমে ৩৩-এ নেমেছে। অর্থাৎ বাজারের আকার বাড়লেও আমদানিতে তাদের আপেক্ষিক অংশ কমেছে প্রায় অর্ধেক।
দুই দশকে আমদানি কমেছে অর্ধেক
২০০২-০৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চাল, ডাল, গম, সয়াবিন তেল, পামতেল ও চিনি—এই ছয় নিত্যপণ্যের আমদানি ছিল প্রায় ২০ লাখ টন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আমদানি করেছিলেন ১২ লাখ টন, যা মোট আমদানির ৬২ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব পণ্যের আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ৯৬ লাখ টনে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অংশ ছিল ৩২ লাখ টন বা ৩৩ শতাংশ।
অর্থাৎ দুই দশকে মোট আমদানি প্রায় পাঁচ গুণ হলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের আমদানি। পরিমাণের হিসাবে তাদের আমদানি ১২ লাখ থেকে বেড়ে ৩২ লাখ টন হয়েছে, কিন্তু বাজারে অংশীদারি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গত ২০ বছরে খাতুনগঞ্জে অনেক ব্যবসায়ী টিকে থাকতে পারেননি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা এবং ব্যবসার নামে লুটপাটের কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঐতিহ্যবাহী এই বাজারও হারিয়েছে আগের জৌলুস।
তিনি বলেন, আগে আমদানিতে লাইসেন্স প্রথা থাকায় কেবল লাইসেন্সধারীরাই অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য বিক্রি করতেন। সেই ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর যে কেউ আমদানি করার সুযোগ পেয়েছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমদানিকারক বাড়ায় খাতুনগঞ্জের অংশ কমেছে।
কারখানায় বিনিয়োগ বড় গ্রুপের, ট্রেডিংয়ে খাতুনগঞ্জ
খাতুনগঞ্জের ব্যবসার বড় শক্তি ছিল আমদানির পর আড়তের মাধ্যমে সারা দেশে পণ্য সরবরাহ। আশির দশকের মাঝামাঝি চট্টগ্রামে বড় ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে ১২টি প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করে। পরবর্তী সময়ে ঢাকাকেন্দ্রিক মেঘনা ও সিটি গ্রুপ পরিশোধনের পাশাপাশি মৌলিক শিল্পেও বিনিয়োগ বাড়ায়। চিনি, আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের উৎপাদনেও বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো কারখানা স্থাপন করে। টি কে গ্রুপও প্রায় দুই দশক আগে ঢাকায় কারখানা গড়ে তোলে।
ব্যবসায়ীদের মতে, রাজধানী ও আশপাশে বড় ভোক্তাবাজার থাকায় সেখানে উৎপাদন ও বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলার সুবিধা বেশি। একই সঙ্গে বাড়ছে প্যাকেটজাত পণ্যের বাজার। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, নিত্যপণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এখন প্যাকেটজাত অবস্থায় বিক্রি হয়। সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে এই হার আরো বেশি। এতে খোলা পণ্যের বেচাকেনা কমছে, যা দীর্ঘদিন খাতুনগঞ্জের ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি ছিল।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ব্যবসা
২০২৫ সালে দেশে মোট ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে এক কোটি ৪১ লাখ টন, যার মূল্য ৭০৫ কোটি ডলার। এসব পণ্য আমদানি করেছে ৪১৮টি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ মোট আমদানির পরিমাণ বড় হলেও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। একই সঙ্গে শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে আমদানির বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক আবুল খায়ের গ্রুপের মালিকানাধীন স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস ২০২৫ সালে প্রায় ৬৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভোজ্যতেল, গম ও ডাল। এস আলম গ্রুপ ২০২৪ সালে ভোগ্যপণ্য আমদানির শীর্ষ পর্যায়ে থাকলেও ২০২৫ সালে আলোচ্য পণ্যগুলো নতুন করে আমদানি করেনি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বাধীন ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজও বড় আমদানিকারক হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তবে এর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা নারায়ণগঞ্জে।
এতে বোঝা যায়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এখনো বড় পরিসরে আমদানি করছে। তবে সেই ব্যবসা আগের মতো খাতুনগঞ্জকেন্দ্রিক না থেকে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণনির্ভর হয়ে উঠছে।
পরিবহন ব্যয়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় বাধা পরিবহন ব্যয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজনসীমা কার্যকরের কারণে ট্রাকপ্রতি পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রতি টনে খরচ বাড়ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। তারা বলেন, একই ভাড়ায় অন্য অনেক রুটে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যায়, চট্টগ্রাম থেকে তা সম্ভব হয় না। ফলে প্রতি টন পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।
খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, সীতাকুণ্ড ও কুমিল্লায় স্থাপন করা ওজন স্কেলের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ট্রাকে একসঙ্গে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারেন না। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং অন্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা অসুবিধায় পড়েন।
বাড়তি ব্যয় এড়াতে কিছু আমদানিকারক চট্টগ্রাম বন্দর থেকে লাইটার জাহাজে সরাসরি নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ কিংবা যশোরের নওয়াপাড়ায় পণ্য পাঠাচ্ছেন। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি হওয়া পণ্যের একটি অংশ খাতুনগঞ্জে না এসে সরাসরি অন্য পাইকারি বাজারে চলে যাচ্ছে।
প্রতারণায় কমেছে পারস্পরিক আস্থা
আশির দশক থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার বাণিজ্য বাড়ার সাথে সাথে খাতুনগঞ্জে লেনদেন বাড়তে থাকে। আমদানির পাশাপাশি ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বেচাকেনাও জমে ওঠে। কাগজভিত্তিক লেনদেনে ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থাই ছিল মূলধন। লিখিত চুক্তির বদলে অনেক ক্ষেত্রেই মুখের কথায় লেনদেন হতো। কিন্তু ধারাবাহিক প্রতারণার ঘটনায় সেই আস্থায় ফাটল ধরেছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে খাতুনগঞ্জে প্রথম প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সেখানে ৬৮টি আর্থিক প্রতারণার ঘটনা সামনে আসে। সাম্প্রতিক সময়েও এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছর প্রায় আট কোটি টাকা পাওনা রেখে এক ব্যবসায়ীর গা-ঢাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের আবু বক্কর বলেন, ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক বিশ্বাস আগের অবস্থায় নেই।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, খাতুনগঞ্জের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়নি; বরং বদলে যাওয়া বাজারব্যবস্থায় টিকে থাকার লড়াই কঠিন হয়েছে। আমদানির পাশাপাশি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণব্যবস্থায় প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে ঐতিহ্যবাহী এই বাজারের আগের আধিপত্য ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

