চট্টগ্রামে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে চলা মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বর্তমানে ১৭টি বড় কারখানা পুরোদমে উৎপাদনে রয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। এ ছাড়া আরো ২৪টি কারখানার নির্মাণকাজ বর্তমানে দৃশ্যমান পর্যায়ে রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে শ্রমিক আবাসন, নতুন বাজার, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে পড়ায় দ্রুত বাড়ছে স্থানীয় জনসংখ্যা ও নাগরিকে সেবার বিশাল চাহিদা। তবে শিল্পায়নের এই বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলাতে পারেনি জরুরি চিকিৎসাসেবা ও জীবনের নিরাপত্তার অবকাঠামো।
বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের জন্য পুরো শিল্পাঞ্চলে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ট্রমা কিংবা বার্ন চিকিৎসাকেন্দ্র। ফলে কারখানায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে মুমূর্ষু ও আশঙ্কাজনক রোগীদের নিয়ে ছুটতে হচ্ছে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ‘ফার্মিক স্টিল লিমিটেড’র কারখানায় ফার্নেস (গলন চুল্লি) ক্রুটির কারণে ফুটন্ত গলিত লোহা ছিটকে পড়ে এক চীনা প্রকৌশলীসহ চারজন দগ্ধ হন। শিল্প পুলিশের সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন— চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির হোসেন (২৭)। দগ্ধ আরেকজন হলেন, শ্রমিক জুয়েল (৩৬)। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কারখানা সূত্র ও পুলিশ জানায়, ঢাকার জাতীয় দগ্ধ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টায় শরিফুল, ২ অক্টোবর সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে ১ অক্টোবর রাত সাড় ৯টায় চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অন্য শ্রমিক মনির হোসেন।
উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু কেবল একটি কারখানার নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বিশাল এই শিল্পাঞ্চলে কর্মরত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এবং আশপাশের ৬টি ইউনিয়নের (ইছাখালী, কাটাছড়া, মিঠানালা, মঘাদিয়া, শাহেরখালী ও মায়ানী) বিশাল জনগোষ্ঠীর জরুরি চিকিৎসাসেবার ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে উপজেলা সদরের হাসপাতালগুলোর দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব আরও প্রায় ৬০ কিলোমিটার। অর্থাৎ দুর্ঘটনাস্থল থেকে চমেক হাসপাতালে পৌঁছাতেই পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ। ট্রাফিকের গতি ও যানজটের ওপর নির্ভর করে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বলেন, শিল্পকারখানার দুর্ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ বা আঘাতপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পরপরই অর্থনৈতিক অঞ্চলে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা, ট্রমা ও বার্ন সেবা দেওয়া সম্ভব হলে অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব। মুমূর্ষু রোগীকে সেখান থেকে শহরের হাসপাতালে আনতে গিয়েই পথিমধ্যে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। প্রাথমিক চিকিৎসার সময় যত কমানো যাবে, জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা তত বাড়বে।
শিল্প পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রায়সুল ইসলাম বলেন, শিল্পাঞ্চলের আয়তন বিশাল এবং প্রতিনিয়ত নতুন কারখানা বাড়ছে। মানুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনাকবলিত ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে। তাই এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল এখন সময়ের দাবি।
পিএইচপি গ্রুপের কনসালট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল মোস্তফা বলেন, শিল্পাঞ্চলের পরিধি বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতাল, ফার্স্ট এইড রুম, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা ও নিয়মিত মহড়া থাকা জরুরি। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের মহাসড়কে ট্রাফিক সংকেত, ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, সড়কবাতি ও সিসিটিভি বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ প্রাইভেট ইকোনমিক জোনস অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ও বেজার সাবেক পরামর্শক মো. আবদুল কাদের খান জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে দ্রুত বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ছে। কিন্তু জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত না করা হলে পরিস্থিতি জটিল হবে। আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের সফলতা কেবল বিনিয়োগে নয়, সেখানে কর্মরত মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার ওপরও নির্ভর করে।
বিনিয়োগকারীদের পক্ষে নাসির উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, এক দশকেও এখানে চিকিৎসার ন্যুনতম সুবিধা গড়ে ওঠেনি। ৮৫ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম শহরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয়। ততক্ষণে জীবন বিপন্ন হয়ে যায়।
এ বিষয়ে বেজার পরিচালক (উন্নয়ন) সালেহ আহমদ জানান, শিল্পাঞ্চলের ব্লক-১৮ এলাকায় হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জমির সীমানাপ্রাচীর ও চাইল্ড হেলথ কেয়ার ভবন নির্মিত হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্য জমি রাখা আছে। তবে সময় ও প্রয়োজনীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলো এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
নিহত শ্রমিকের পরিবারের আহাজারি আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মধ্যে এখন পুরো শিল্পাঞ্চলের একটাই দাবি—আর কোনো প্রাণহানি নয়, অবিলম্বেই নিশ্চিত করা হোক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ট্রমা ও বার্ন ইউনিট এবং ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


