চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের বিএনপি প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হাইকোর্টের কোনো স্বাক্ষরিত আদেশ ছাড়াই, এমনকি অনলাইন বা অফলাইন কোনো কপি ছাড়া কেবল টিভি স্ক্রল দেখে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক প্রতীক বরাদ্দের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
আইনজীবীরা বলছেন, এটি শুধু নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধি লঙ্ঘন নয়, বরং বিচারব্যবস্থার মৌলিক প্রক্রিয়ার প্রতি এক বড় প্রশ্ন। স্বাক্ষরহীন আদালতের আদেশ কার্যকর নয়, আর সেটিকে ভিত্তি করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া আইনগতভাবে অবৈধ।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে সরওয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা স্থগিত করে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট আদেশ দেন। আদেশের ওই কপি তখনো প্রকাশ হয়নি, বিচারক তখনো এজলাসে। এরই মধ্যে টিভি স্ক্রল দেখে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া ধানের শীষের প্রতীক বরাদ্দ দেন বলে অভিযোগ উঠে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসমাইল গণি বলেন, হাইকোর্ট দুপুরে যে মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটি এখনো সাইনড কপি নয়। স্বাক্ষরহীন অবস্থায় কোনো আদেশই কার্যকর হয় না। এ ধরনের অসম্পূর্ণ আদেশকে ভিত্তি করে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া সরাসরি বেআইনি বা অবৈধ সিদ্ধান্ত।
তিনি আরো বলেন, প্রশাসন আদালতের সাইনড কপি পাবে, সেটি ইসির নথিতে আসবে, তারপর রিটার্নিং কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নেবেন। এটাই আইনগত প্রক্রিয়া। কিন্তু এখানে টিভির স্ক্রল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি আদালতের আদেশকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করার শামিল।
ইসমাইল গণির মতে, দুপুরে হাইকোর্টের মৌখিক পর্যবেক্ষণ চলার সময়ই প্রতীক বরাদ্দ দিছে জেলা প্রশাসক। হাইকোর্টের রায়ের পর বিকেলেই ফাইল করি, তখনই আপিল বিভাগে সাব–জুডিস হয়ে যায়। তার ভাষায়, উচ্চ আদালতে বিষয় বিচারাধীন থাকা অবস্থায় জেলা প্রশাসকের এমন তড়িঘড়ি আচরণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর সন্দেহ তৈরি করে।
আদালতে সরোয়ার আলমগীরের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও মো. রুহুল কুদ্দুস শুনানি করেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুল আমিনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন ও আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. রাজু মিয়া।
আহসানুল করিম বলেন, মনোনয়ন বাতিলের ইসির সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। সরোয়ার আলমগীরকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তার নির্বাচনে অংশ নিতে আইনগত বাধা নেই।
ইসির নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আদালতের আদেশ কার্যকর করতে হলে সেটির অফিশিয়াল কপি ইসিতে জমা দিতে হয়। কিন্তু ইসি সূত্র বলছে, এখনো কোনো নথি তারা পায়নি।
ইসির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের কাছে কোনো কাগজ আসেনি। টেলিভিশন দেখে প্রতীক বরাদ্দ, এটি খতিয়ে দেখার মতো ঘটনা। নিয়ম হলো আদালতের কাগজ দেখা, সংবাদ নয়।
তার মতে, নথি ছাড়া প্রতীক বরাদ্দ হলে সেটি নীতিগত দুর্বলতা, যা পরবর্তী আইনি পর্যায়ে টিকবে কি না সন্দেহ রয়েছে।
হাইকোর্টের মৌখিক পর্যবেক্ষণের পরই সরোয়ার আলমগীরের বিষয়ে ‘সিভিল মিসেলিনিয়াস পিটিশন নং ৮২/২০২৬’ আপিল বিভাগে দাখিল হয়। আবেদনটি গ্রহণ করেছে আদালত। এর ফলে পুরো বিষয়টি এখন বিচারাধীন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসমাইল গণি বলেন, আপিল বিভাগে আবেদন গৃহীত হওয়ার পর প্রশাসন কোনোভাবেই নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ওপরের আদালতে বিষয় বিচারাধীন থাকলে অপেক্ষা করাই উচিত ছিল।
জেলা প্রশাসকের ‘অতি উৎসাহ’ নিয়ে প্রশ্ন
প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে জেলা প্রশাসক কেন এমন তড়িঘড়ি করলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এটাই আলোচনার বিষয়। চট্টগ্রাম-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন বলেন, টিভি দেখে প্রতীক বরাদ্দ সন্দেহজনক। এর পেছনে কী উদ্দেশ্য আছে, তদন্ত হওয়া উচিত।
নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রতিটি প্রার্থীকে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসির। কিন্তু মামলা বিচারাধীন, আদেশ স্বাক্ষরিত নয়, নথি ইসিতে পৌঁছেনি—এ অবস্থায় সরোয়ার আলমগীরকে প্রতীক দেওয়া অন্যদের জন্য বৈষম্যের উদাহরণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া স্বাক্ষরিত ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দের চিঠি আমার দেশের হাতে এসেছে। এই বিষয়ে বারবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি উত্তর দেননি।
এর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে ইসিতে আপিল করা হয়েছিল। জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন অভিযোগটি করেছিলেন।
শুনানি নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন (ইসি) সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে। তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। এর বৈধতা নিয়ে প্রার্থিতা ফিরে পেতে সরোয়ার আলমগীর ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


চট্টগ্রাম-২ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেলেন বিএনপির সরোয়ার