শিক্ষকরা বেতন পান না, বন্ধ প্রাথমিক বিদ্যালয়

শিক্ষকরা বেতন পান না, বন্ধ প্রাথমিক বিদ্যালয়

একসময় যেখানে শতাধিক শিশু শিক্ষার্থীর কোলাহলে মুখরিত ছিল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, আজ সে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শুধুই নীরবতা। ধুলামাখা বেঞ্চে পড়ে আছে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা। দেয়ালে এখনো টাঙানো রয়েছে শিশুদের নানা স্মৃতি। দেখে মনে হয়, এই বুঝি আবার বই-খাতা হাতে ছুটে আসবে শিশুরা। কিন্তু শিক্ষকদের বেতন সংকটে প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বিদ্যালয়টি।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালিপাড়ার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ২০০২ সালে স্থানীয় এক শিক্ষানুরাগী বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় আনোয়ার আলীর স্ত্রী জায়তুল নেছা জুতি প্রায় ৪০ শতক জমি দান করেন।

পরে উপজেলার সরকারি মাতামুহুরী কলেজের শিক্ষক মোহাম্মদ হোসাইন, জায়তুল নেছা জুতি, নেজাম উদ্দিন ও মো. জিয়াবুলের উদ্যোগে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্থানীয় বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালিপাড়ার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয় এ বিদ্যালয়ে। ৮-৯ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে আর কোনো বিদ্যালয় না থাকায় মিরিঞ্জা বিদ্যালয়টিই ছিল শিক্ষার অন্যতম ভরসা। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সময়ের সঙ্গে বিদ্যালয়টি আর্থিক সংকটে পড়ে। এতে শিক্ষক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকে।

পরে জাগো ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিদ্যালয়টিতে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে কিছুটা সময় শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকলেও স্থায়ীভাবে শিক্ষক সংকটের সমাধান হয়নি। একপর্যায়ে ২০২৫ সালে শিক্ষক সংকট ও আর্থিক সমস্যার কারণে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

শিক্ষক জিয়াবুল বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে বিনা বেতনে মিরিঞ্জা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করেছি। কোনো বেতন পাইনি। তাই এখন অন্য পেশা বেছে নিয়েছি।

সরেজমিন দেখা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও বেঞ্চে ধুলা জমেছে, কোথাও পড়ে আছে পুরোনো বই-খাতা। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত বই-খাতা এখনো শ্রেণিকক্ষে পড়ে আছে। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়জুড়ে নেমে এসেছে নীরবতা।

বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরাও দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একটি বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।

বিদ্যালয়ের তৎকালীন সভাপতি চাকনাই ম্রো বলেন, প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে বিদ্যালয়টি ছিল প্রাণবন্ত। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে নিয়মিত পাঠদান হতো। পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ফলাফলও ভালো ছিল। এ বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

লামা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, মিরিঞ্জাসহ আশপাশের দুর্গম এলাকার শিশুদের জন্য বিদ্যালয়টির গুরুত্ব রয়েছে। এটি পুনরায় চালু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এলাকার শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং নিরক্ষরতা কমাতে ভূমিকা রাখবে।

এ বিষয়ে লামা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, মিরিঞ্জা বিদ্যালয়টি বন্ধ রয়েছে বলে শুনেছি। বিদ্যালয়টি পরিচালনার জন্য কার্যকর ও দায়িত্বশীল উদ্যোক্তার অভাবই বন্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সরকারি সহায়তা বা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে এ পর্যন্ত কেউ উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করেননি। যোগাযোগ করা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন