আমার দেশে সংবাদ প্রকাশ, ৮ কোটি টাকা ফেরত পেল সরকার

আমার দেশে সংবাদ প্রকাশ, ৮ কোটি টাকা ফেরত পেল সরকার

আমার দেশ-এ সংবাদ প্রকাশের পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি’ প্রকল্পের আওতায় ফেনীর ৭ খাল পুনঃখনন প্রকল্পের প্রায় ৮ কোটি টাকা ফেরত পেয়েছে সরকার। বুধবার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগে গত ২০ জুন দৈনিক আমার দেশ-এ ‘ফেনীর ৭ খাল পুনঃখননে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ’ শিরোনামে তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এতে জেলার সাতটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে। এর মধ্যে কাগজে-কলমে ২ হাজার ৭৭৮ জনের বেশি শ্রমিক দিয়ে এসব প্রকল্পের কাজ পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে খননকাজে শুধু এক্সকাভেটর ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় দরিদ্র শ্রমিকেরা কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং নির্ধারিত গভীরতা ও প্রস্থ বজায় না রাখার চিত্রও তুলে ধরা হয়।

এ ছাড়া নানা অনিয়মের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ এবং প্রকল্প শুরুর আগে অনেককে কাজ দেওয়ার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সংগ্রহ করলেও প্রকল্প উদ্বোধনের পর তাদের কাউকেই কাজে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে ফেনী সদর উপজেলার শর্শদিতে ইউএনও পরিদর্শনে যাবেন, তাই তড়িঘড়ি করে এক দিনের জন্য স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ইউনিয়ন বিএনপির কর্মীদের শ্রমিক বানানো হয়। অথচ দ্রুত কাজ শেষ করে অধিক লুটপাটের জন্য শ্রমিকের পরিবর্তে নামমাত্র কাজে ব্যবহার করা হয় ছয়টি ভেকু মেশিন। এমন তথ্যও উঠে আসে আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে।

ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। টনক নড়ে ফেনী জেলা প্রশাসনসহ প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরও নজরে আসে। ফলে কাজ শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ৭টি খালের অব্যয়িত ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফেনীতে মোট ১২ কোটি ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৮ টাকা বরাদ্দ আসে। এর মধ্যে সোনাগাজীর ডাংগি খাল পুনঃখনন (নুর আলমের বাড়ির উত্তর পাশ হতে ফেনী নদী পর্যন্ত) প্রকল্পে জেলা কর্ণধার কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত সাড়ে ৮ কিলোমিটারের মধ্যে ৫ কিলোমিটার খননের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ২ কোটি ৮১ লাখ ৩৯ হাজার ৪৩৮ টাকা (ওয়েজ) এবং ২ কোটি ৫৮ লাখ ১১ হাজার ৫০৭ টাকা (নন-ওয়েজ) বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে (ওয়েজ) ৩ লাখ ২৯ হাজার ৫০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ৭৩ লাখ ১ হাজার ৫৭১ টাকা। অব্যয়িত টাকা (ওয়েজ) ২ কোটি ৭৮ লাখ ১০ হাজার ৩৭৮ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ২ কোটি ১২ লাখ ৯ হাজার ৩৩৬ টাকা। অর্থাৎ এ উপজেলা থেকে ফেরত গেছে ৪ কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার ৩২৪ টাকা। কাজের অগ্রগতির হার দেখানো হয়েছে ৫৮.৮৫ শতাংশ।

ফুলগাজীর গতিয়া খালের তারালিয়া-নোয়াপুর অংশে (গতিয়া খাল থেকে সিলোনিয়া খাল পর্যন্ত) জেলা কর্ণধার কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ২ কিলোমিটারের মধ্যে ২ কিলোমিটারই খননের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৪০ টাকা (ওয়েজ) এবং ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৫ টাকা (নন-ওয়েজ) বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে (ওয়েজ) ১৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৭৫৪ টাকা। অব্যয়িত টাকা (ওয়েজ) ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৪০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ৪ লাখ ৬ হাজার ২০১ টাকা। অর্থাৎ এ উপজেলা থেকে ফেরত গেছে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ টাকা। কাজের অগ্রগতির হার দেখানো হয়েছে ১০০ শতাংশ।

পরশুরামের বক্সমাহমুদ ভেদা খাল (দক্ষিণ টেটেশ্বর থেকে কহুয়া নদী পর্যন্ত) প্রকল্পে জেলা কর্ণধার কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ৩ কিলোমিটারের মধ্যে ২.৬ কিলোমিটার খননের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ৩৮ লাখ ৪০ হাজার ৯১০ টাকা (ওয়েজ) এবং ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩৩ টাকা (নন-ওয়েজ) বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে (ওয়েজ) ০০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ৩১ লাখ ১৯ হাজার ৭৮২ টাকা। অব্যয়িত টাকা (ওয়েজ) ৩৮ লাখ ৪০ হাজার ৯১০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ৭ লাখ ৬৮ হাজার ১৫১ টাকা। অর্থাৎ এ উপজেলা থেকে ফেরত গেছে ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৬১ টাকা। কাজের অগ্রগতির হার দেখানো হয়েছে ৮৬.৬৭ শতাংশ।

ফেনী সদরের দাউদপুর-মধুয়াই খাল (মধুয়াই ব্রিজ থেকে মধুয়াই হয়ে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত) প্রকল্পে জেলা কর্ণধার কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ৫.৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৫.৫ কিলোমিটারই খননের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ১ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার ৯৯৯ টাকা (ওয়েজ) এবং ১ কোটি ২৯ লাখ ৫৯ হাজার ৭৭৬ টাকা (নন-ওয়েজ) বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে (ওয়েজ) ২৩ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ১ কোটি ২৭ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৫ টাকা। অব্যয়িত টাকা (ওয়েজ) ১ কোটি ৪ লাখ ১২ হাজার ১৯৯ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ২ লাখ ১২ হাজার ৪১১ টাকা। কাজের অগ্রগতির হার দেখানো হয়েছে ১০০ শতাংশ। ফেরত গেছে ১ কোটি ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬১০ টাকা। একই উপজেলার মোহাম্মদ আলী খাল (মোহাম্মদ আলী বাজার থেকে এলাহীগঞ্জ পর্যন্ত) প্রকল্পে জেলা কর্ণধার কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ৫.৭২৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৫.৭২৫ কিলোমিটারই খননের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ৭২ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫৮ টাকা (ওয়েজ) এবং ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২ টাকা (নন-ওয়েজ) বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে (ওয়েজ) ১৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ৭১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭০ টাকা। অব্যয়িত টাকা (ওয়েজ) ৫৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫৮ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪০২ টাকা। কাজের অগ্রগতির হার দেখানো হয়েছে ১০০ শতাংশ। ফেরত গেছে ৬১ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ টাকা। অর্থাৎ এ উপজেলা থেকে ফেরত গেছে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার ১৭ টাকা।

দাগনভূঞার রাজাপুর ইউনিয়নের জয়নারায়নপুর থেকে বিরোলি খাল পর্যন্ত প্রকল্পে জেলা কর্ণধার কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ১ কিলোমিটারের মধ্যে ১ কিলোমিটারই খননের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৪০ টাকা (ওয়েজ) এবং ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৫ টাকা (নন-ওয়েজ) বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে (ওয়েজ) ০০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৭ টাকা। অব্যয়িত টাকা (ওয়েজ) ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৪০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ৯ লাখ ৯৬ হাজার ৪৮১ টাকা। ফেরত গেছে ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫২১ টাকা। কাজের অগ্রগতির হার দেখানো হয়েছে ১০০ শতাংশ। একই উপজেলার জয়লস্কর ইউনিয়নের সিলোনিয়া বাজার থেকে নেয়াজপুর খাল পর্যন্ত প্রকল্পে জেলা কর্ণধার কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ২ কিলোমিটারের মধ্যে ২ কিলোমিটারই খননের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৪০ টাকা (ওয়েজ) এবং ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৫ টাকা (নন-ওয়েজ) বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে (ওয়েজ) ০০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৮৬৯ টাকা। অব্যয়িত টাকা (ওয়েজ) ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৪০ টাকা এবং (নন-ওয়েজ) ৮৬ টাকা। ফেরত গেছে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ১২৬ টাকা। কাজের অগ্রগতির হার দেখানো হয়েছে ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ এ উপজেলা থেকে ফেরত গেছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৭ টাকা।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম ফেনী থেকে ৭ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ টাকা ফেরত যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, উক্ত ফেরতকৃত টাকা চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন