কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গোয়ালমারী বাজার থেকে জুরানপুর বাজার হয়ে সুন্দলপুর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা ও চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে আছে। বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি এখন এলাকাবাসীর জন্য এক নীরব দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পাঁচটি ইউনিয়নের হাজারো মানুষ। বর্ষা মৌসুমে সড়কের বড় বড় গর্তে হাঁটুসমান পানি জমে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, এভাবে যদি পানি জমেই থাকে, তবে সেখানে মাছের পোনা ছেড়ে মাছ চাষ করাই ভালো।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গোয়ালমারী বাজার থেকে জুরানপুর বাজার পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ছোট–বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও পিচঢালাই পুরোপুরি উঠে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই গর্তগুলো পানিতে ভরে যায় এবং সড়কটি পরিণত হয় কাদা ও পানির ফাঁদে। এতে প্রতিনিয়তই উল্টে পড়ছে অটোরিকশা ও ছোট যানবাহন। আহত হচ্ছেন যাত্রীরা। কাদাপানি ছিটকে পাশের দোকানপাট ও পথচারীদের পোশাক নষ্ট হওয়াও যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির এমন বেহাল অবস্থা থাকলেও এখনো স্থায়ী কোনো সংস্কার উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে প্রতিদিন স্কুল–কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগী, গর্ভবতী নারী এবং সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছেন।
গোয়ালমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান প্রধান বলেন, প্রায় এক দশক ধরে এই সড়কে বড় ধরনের কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় একাধিকবার বিষয়টি তুলে ধরেছি। সুন্দলপুর থেকে জুরানপুর পর্যন্ত অংশের জন্য টেন্ডার হলেও জুরানপুর থেকে গোয়ালমারী অংশটির অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। অথচ এই সড়ক দিয়ে অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নের মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করে।
গোয়ালমারী বাজারের ব্যবসায়ী মো. সোহেল রানা বলেন, এই অঞ্চলে জুরানপুর কলেজ, নলচক বড় মাদ্রাসা, একাধিক উচ্চবিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেজি স্কুল এবং নূরানী হাফেজি মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের প্রধান ভরসা এই সড়কটি। কিন্তু রাস্তার এমন অবস্থার কারণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সড়কের পাশের গ্রামের কয়েকজন জেলে আক্ষেপ করে বলেন, বর্ষা এলেই সড়কের বড় বড় গর্তে হাঁটুসমান পানি জমে থাকে। অনেক সময় সপ্তাহের পর সপ্তাহ সেই পানি শুকায় না। এমন পরিস্থিতিতে মজা করেই আমরা বলি, এখানে যদি মাছের পোনা ছেড়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো মাছ চাষই করা যাবে।
মহন্থন গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ট্রাকচালক বয়োবৃদ্ধ নুরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া বা গর্ভবতী নারীকে এই রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় অটোরিকশা উল্টে যায়। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা সব সময়ই থাকে।
লামছড়ি গ্রামের বাসিন্দা আমেনা স্বর্ণা ও তাসলিমা বলেন, সড়কের এমন অবস্থার কারণে অনেক সময় আত্মীয়স্বজনও এ এলাকায় আসতে চান না। এমনকি বিয়ের প্রস্তাব নিয়েও অনেক পরিবার এদিকে আসতে অনাগ্রহ দেখায়। ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবের সময়ও অনেকেই দাওয়াত পেলেও আসতে চান না, শুধু এই সড়কের দুরবস্থার কারণে।
গাড়িচালক কামাল, সাদ্দাম ও নজরুল বলেন, রাতের বেলায় এই সড়ক দিয়ে চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বৃষ্টির সময় গর্তগুলো পানিতে ভরে যায়, তখন কোনটা রাস্তা আর কোনটা গর্ত বোঝা যায় না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দাউদকান্দি উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কটির সমস্যার বিষয়টি আমাদের জানা আছে। কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কটি সংস্কারের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা না হলে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে মানুষের এই দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান ঘটাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

