দুই অস্ত্রধারী চিহ্নিত, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তাল নগরী

চট্টগ্রাম ব্যুরো

দুই অস্ত্রধারী চিহ্নিত, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তাল নগরী

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গত মঙ্গলবার ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের সময় অনেককে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশের দাবি, সবাইকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।

এদিকে মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল বুধবার দিনভর ছাত্রদল ও শিবিরের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তাল ছিল চট্টগ্রাম নগরী। এসব কর্মসূচিতে দুই দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও অংশ নেন।

বিজ্ঞাপন

সংঘর্ষের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মোছা নিয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকেই সিটি কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরের আগেই এক দফা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ। এ ঘটনার জেরে বিকেলে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের সংঘর্ষে জড়ান দুই দলের নেতাকর্মীরা। সংঘর্ষে দুই পক্ষের অনেক বহিরাগত নেতাকর্মীকে অংশ নিতে দেখা যায়।

ঘটনার ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংঘর্ষের দ্বিতীয় দফার শুরুতে ছাত্রদলের মিছিল থেকে অন্তত পাঁচজনকে শিবিরের দিকে তেড়ে যেতে দেখা যায়। তাদের সবার হাতেই রামদা ও কিরিচ ছিল। এর মধ্যে সাদা টি-শার্ট ও ক্যাপ পরিহিত এক যুবককে সরাসরি প্রতিপক্ষের দিকে ধারালো কিরিচ উঁচিয়ে তেড়ে যেতে দেখা যায়। কালো পোশাকধারী আরেক যুবক মাথায় হেলমেট পরে ধারালো অস্ত্র হাতে রাস্তায় অবস্থান করেন। তার নাম নূর নবী রিশাদ। তিনি সরকারি সিটি কলেজের মানবিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

আরেকজন ছাত্রদলের মিছিলের সম্মুখ সারিতে থাকা নীল রঙের শার্ট পরা ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব মির্জা ফারুক। এ সময় ছাত্রদলের মিছিলে রামদা হাতে থাকা আরো দুজনের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি। এছাড়া ছাত্রদলের মিছিলের মধ্যে চারজনকে ছাত্রলীগের স্টাইলে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। এর মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তিনি কমার্স কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক পলাশ।

কিরিচ হাতে ভাইরাল হওয়া ছবির বিষয়ে জানতে এমইএস কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব মির্জা ফারুকের মুঠোফোনে কল দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। আরেক অভিযুক্ত নূর নবী রিশাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সিটি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সৈয়দ সিদ্দিকী বলেছেন, রিশাদ মিছিলে ছিল। তবে কিরিচ হাতে ব্যক্তিটি রিশাদ নয় বলে তার দাবি।

সংঘর্ষে আরেকজনকে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও কালো টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে, যিনি শিবিরের মিছিলের দিকে কিরিচ নিয়ে তেড়ে যান। ছাত্রদলের হামলায় নগরের বিভিন্ন জায়গা থেকে নেতাকর্মীরা আসেন। সেটি স্বীকার করে নগর ছাত্রদল আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, শিবির যখন বহিরাগত নিয়ে মিছিল করছে, তখন শিক্ষার্থীদের রক্ষায় নগরের বিভিন্ন স্থান থেকে মিছিলে আমাদের নেতাকর্মীরাও শরিক হন।

তিনি অভিযোগ করেন, শিবিরের ফেলে যাওয়া রামদা-কিরিচ হয়তো কেউ কেউ কুড়িয়ে নিয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে এখনো থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়নি। তারা যদি মামলা করে, আমাদেরও ১০-১২ জন আহত হয়েছেন, আমরাও মামলা করব।

অন্যদিকে মঙ্গলবারের সংঘর্ষের পর ছাত্রশিবিরের কয়েকজনকে লাঠিসোঁটা হাতে মিছিলে দেখা গেছে। কেউ কেউ পাথর নিক্ষেপ করেছেন। এর মধ্যে জামায়াতকর্মীও ছিলেন। ছাত্রদলের দিকে লাঠিসোঁটা হাতে তেড়ে যেতে দেখা গেছে তামাকুমন্ডি লেন বণিক সমিতির প্রচার সম্পাদক ছাদেক হোছাইনকে।

থমথমে সিটি কলেজ

সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার রাতেই বুধবারের ক্লাস পরীক্ষা স্থগিত করে সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ। সকাল থেকে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আতঙ্কে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে আসেননি। তবে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা গতকাল কলেজ ক্যাম্পাসকে ঘিরে মহড়া দিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, সরকারি সিটি কলেজ বহু বছর ধরে ছাত্রলীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে ছাত্রদল কিংবা শিবিরের শক্ত কোনো অবস্থান ছিল না কখনই। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর হঠাৎ করেই কেউ ছাত্রদল, আবার কেউ শিবিরের নেতাকর্মী বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এ দুদলের আধিপত্যে নব্য লড়াইয়ে মঙ্গলবার নিউ মার্কেট থেকে শুরু করে নালাপাড়া পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

সংঘর্ষের পর থেকে উত্তপ্ত চট্টগ্রাম

সিটি কলেজ সংঘর্ষের ঘটনায় গোটা চট্টগ্রাম নগরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার রাতেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রদল ও শিবির। রাত ১০টার দিকে খুলশীর সেগুনবাগান এলাকায় জামায়াতের ইসলামি পাঠাগারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সিটি কলেজ সংঘর্ষের জেরেই এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এ হামলার জন্য ছাত্রদল ও যুবদলকে দায়ী করা হয়। ছাত্রদল ও যুবদলের ওই হামলায় আট নেতাকর্মী আহত হন বলেও দাবি করা হয়।

এছাড়া গতকাল সকাল থেকে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ সমাবেশ ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নগরী।

গতকাল বিকালে নগরীর রেলস্টেশন থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্রদল। এতে নেতৃত্ব দেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির।

মিছিলপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আজ থেকে বাংলাদেশের কোনো ক্যাম্পাসে আর গুপ্তরাজনীতি চলবে না। ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে গুপ্তরাজনীতি প্রতিহত করবে। এনসিপির রাজনীতিতেও গুপ্ত শিবির ঢুকে পড়েছে। সংরক্ষিত আসনে মনোনীতদের দেখে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

ছাত্রদল কিরিচের রাজনীতি করছে : সাদিক কায়েম

সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের দেখতে গতকাল সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম চট্টগ্রামে যান। পরে চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলীর সঙ্গে দেখা করে সিটি কলেজে সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে স্মারকলিপি দেন তিনি।

এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সাদিক কায়েম। তার অভিযোগ, ছাত্রলীগ হেলমেট পরে চাপাতি আর হাতুড়ির রাজনীতি করত। এখন ছাত্রদল কিরিচের রাজনীতি শুরু করেছে। প্রকাশ্য রাজনীতি বলতে তারা কিরিচ দিয়ে গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করাকে বোঝাতে চাচ্ছে।

তিনি বলেন, আগামীর বাংলাদেশ আর এই রাজনীতি দেখতে চায় না। ছাত্রসমাজও এই রাজনীতি প্রতিহত করবে। মঙ্গলবারের সংঘর্ষে শিবিরের ৩০ জন আহত হন বলে দাবি করে সাদিক কায়েম জানান, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে : সিএমপি কমিশনার

এদিকে সংঘর্ষের বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, সংঘর্ষের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। ঘটনাস্থলের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অস্ত্রধারীদের কয়েকজনকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরো যারা আছে, তাদেরও চিহ্নিত করার কাজ চলছে। অস্ত্রধারী-সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান সিএমপি কমিশনার।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...