নবীনগরে সড়কের কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলন, চরম দুর্ভোগে এলাকাবাসী

জালাল উদ্দিন মনির, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

নবীনগরে সড়কের কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলন, চরম দুর্ভোগে এলাকাবাসী

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও সড়কটি এখন চলাচলের অযোগ্য মরণফাঁদে পরিণত হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে আলীয়াবাদ-গোপালপুর সড়ক প্রকল্পের ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সড়কের কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পান ‘মেসার্স লোকমান হোসেন’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ওই ঠিকাদার কাজ শেষ না করেই নিয়মবহির্ভূতভাবে উপজেলা প্রকৌশলী, তদারকিকারী প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রকল্পের ২ কোটি ২৯ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করে নিয়ে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে ও এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আলীয়াবাদ-গোপালপুর সড়কের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি কাজ। ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সড়কে কাগজে-কলমে ৩ কিলোমিটার কাজ হয়েছে বলা হলেও, দেখে বোঝার উপায় নেই এই সড়কে কোনো কাজ হয়েছে। যেটুকু কাজ হয়েছে তা নিম্নমানের হওয়ার কারণে পিচ উঠে গিয়ে খানাখন্দ ও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে গেছে। এরপরও এই সড়কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত শতাধিক অটোরিকশাসহ পিকআপ ভ্যান, ট্র্যাক্টর ও মাইক্রোবাস চলাচল করতে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।

রেজতপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “এই সড়ক দিয়ে গোপালপুর, আইতলা, রেজতপুর, সাদেকপুর, সাহেবনগর এবং নবীনগর পৌরসভার আলীয়াবাদ গ্রামের পশ্চিম পাড়াসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের উপজেলা শহরে, হাট-বাজারে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। এই সড়ক ছাড়া তাদের বিকল্প কোনো রাস্তা নেই।” তিনি আরও বলেন, ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে সড়কের এই অবস্থা হয়েছে।

গোপালপুর গ্রামের মতিউর রহমান বলেন, “সড়কের কাজ শেষ না হওয়ার কারণে যাতায়াত করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একটা রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে পারি না, শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়া করতে পারে না। অনেক সময় অটোরিকশা গর্তে পড়ে উল্টে গিয়ে ঘটছে দুর্ঘটনা।”

রেজতপুর গ্রামের বাসিন্দা নাছির উদ্দিন বলেন, “সড়কের পাশে রেজতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। খানাখন্দের কারণে বৃষ্টির সময় সড়কে পানি জমে থাকায় কোমলমতি অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে গিয়ে পানিতে পড়ে যায়; ফলে কাদায় নষ্ট হয়ে যায় তাদের পোশাক।” তিনি আরও বলেন, পানি নিষ্কাশনের জন্য সড়কের পাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে যায়, সে কারণে ড্রেন করা জরুরি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাদেকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, “খানাখন্দভরা এই সড়ক দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এই সড়ক দিয়ে একবার কেউ গেলে দ্বিতীয়বার আর যাওয়ার সাহস করবে না। আমাদের যেতে হয় চাকরির জন্য। মাঝে মাঝে মনে চায় চাকরিটাই ছেড়ে দিই।”

অটোরিকশা চালকরা জানান, সড়কে বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে খানাখন্দের কাদায় গাড়ি আটকে বন্ধ হয়ে যায়, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ। মাঝপথেই যাত্রীদের নামিয়ে দিতে হয়। তারা আরও বলেন, পরিবারের লোকজনের ভরণপোষণের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সড়কে গাড়ি চালাতে হচ্ছে।

সড়কের যাত্রীরা বলেন, এই সড়ক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। যাদের অবহেলা ও অনিয়মের কারণে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়াসহ সড়কের কাজ দ্রুত সময়ে শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।

নবীনগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফেরদৌস আলী বলেন, “আমি যোগদান করেছি বেশি দিন হয়নি। আমার হাত দিয়ে এই কাজের কোনো বিল দেওয়া হয়নি। আমি যোগদানের পরই আলীয়াবাদ-গোপালপুর সড়কে কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলন করার বিষয়টি নজরে এসেছে।” এ বিষয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদার লোকমান হোসেনের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন