আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গণভোটের প্রচারে প্রাণ নেই, বিভ্রান্তিতে সাধারণ মানুষ

এম কে মনির, চট্টগ্রাম

গণভোটের প্রচারে প্রাণ নেই, বিভ্রান্তিতে সাধারণ মানুষ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণভোটের প্রচারে তেমন কোনো তোড়জোড় নেই বন্দরনগরীতে। নগরের কোথাও কোথাও ভোটের গাড়ি নামানো হলেও সরকারি উদ্যোগে জোরেশোরে কোনো প্রচার চালানো হচ্ছে না। এমনকি উপজেলাগুলোতেও একই হাল দেখা গেছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুধু জামায়াতে ইসলামী ঘরে ঘরে ‍লিফলেট পৌঁছে দিচ্ছে। তবে গণভোট নিয়ে সরকারের চালানো প্রচারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাকর্মীরা এই কার্যক্রম থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ বিরত রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপিকেও দৃশ্যমান কোনো প্রচারে নামতে দেখা যায়নি। তবে তারা জানান, দুয়েক দিনের মধ্যে জোরালো প্রচারে নামবে তাদের নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় গণভোট নিয়ে অনেকটাই বিভ্রান্তিতে আছেন চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, অলিগলি, চায়ের দোকান, পাড়া-মহল্লার ক্লাবে আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা থাকলেও গণভোট নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। অনেকেই গণভোট নিয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা পাননি। কেউ কেউ কেবল ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের কথা শুনলেও এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই তাদের। অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষ গণভোট নিয়ে ধোঁয়াশায় আছেন।

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোটের প্রচার সংক্রান্ত কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক আলী রীয়াজ মসজিদের ইমাম এবং মুয়াজ্জিনদের নিয়ে সম্মেলন করেছেন। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদেরও গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে উৎসাহিত করেছেন তারা।

গত রোববার নগরীর অন্তত ৫০ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে ‘আমার দেশ’-এর প্রতিনিধি। তাদের ৯৯ শতাংশ গণভোট সম্পর্কে জানেন না। নগরের আলমাস সিনেমা মোড়ে রিকশা চালক রহিম তালুকদারের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, গণভোট কি তা তিনি জানেন না। কেউ তাকে এ সম্পর্কে বলেনি। শাহিন মিয়া নামে আরেকজন বলেন, নির্বাচনে ভোট দেব, কিন্তু গণভোট কি তা জানি না। সিএনজি অটোরিকশা চালক মো. মনির হোসেন বলেন, শুনেছি, কিন্তু বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট না।

চা দোকানি হান্নান শাহ বলেন, আমাদের জানানোর কথা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর। কিন্তু কারো থেকে জানতে পারিনি গণভোট নিয়ে। আউয়াল নামে মাছ ব্যবসায়ী বলেন, গণভোট হচ্ছে নির্বাচন চাই কি না, সেই বিষয়ে মতামত দেওয়া। একই ভুল ধারণা নিয়ে ঘুরছেন আব্দুল জলিলও। তিনি মনে করেন, গণভোট হচ্ছে ইউনূস সরকারকে আবারও চাই, নাকি অন্য সরকার। তবে কেবল একজন ব্যক্তি গণভোট সম্পর্কে প্রতিবেদককে ব্যাখ্যা দিতে পেরেছেন। পেশায় তিনি গাড়ি চালক।

এদিকে জেলার সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান, বাঁশখালী, রাঙ্গুনিয়াসহ ১৫টি উপজেলায়ও তেমন কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা প্রশাসন ও পৌর প্রশাসন ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো সেমিনার, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং উঠান বৈঠক করেনি।

সীতাকুণ্ডের সমাজকর্মী আরাফাত এলাহী বলেন, সরকার যেই উদ্যোগ নিয়েছে সেটি এখনো তৃণমূলে প্রভাব ফেলেনি। তাছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও অনীহা রয়েছে। তারা চাইলে সেবাপ্রার্থীদের বলতে পারে। কিন্তু সেটি আমরা দেখছি না। গণভোট সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে এই প্রচার যথেষ্ট নয় বলেও মনে করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘরে ঘরে লিফলেট পৌঁছে দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। মহিলা জামায়াতের দায়িত্বশীলরাও পাড়ায় পাড়ায় লিফলেট বিতরণসহ নারীদের গণভোট সম্পর্কে জানাচ্ছেন। গণভোট সম্পর্কে মানুষকে জানাতে তারা বিশেষ প্রচার সপ্তাহ ঘোষণা করেছেন।

নগরীর আকবরশাহ এলাকার বাসিন্দা আয়শা আক্তার বলেন, আমাদের এলাকায় প্রত্যেক ঘরে জামায়াতের নারী দায়িত্বশীলরা এসেছেন। তারা হাতে হাতে জুলাই লিফলেট পৌঁছে দিচ্ছেন। নগরীর বায়েজিদের বাসিন্দা রাজু আহমেদ জানান, মহল্লাতে জামায়াতের পক্ষ থেকে ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। ঘরে ঘরে তারা লিফলেট বিতরণসহ গ্রুপ আকারে মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন গণভোট কী ও কেন? অন্য কোনো দলকে এরকম প্রচারে দেখিনি।

তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বিএনপি নেতারা গণভোটের পক্ষে কোনো প্রচার এখনো শুরু করেনি। এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী রাফসান জনি বলেন, আমাদের দল থেকে মোট ২৭০ জন অ্যাম্বাসেডর নিয়োগ করা হয়েছে গণভোটের পক্ষে প্রচার করার জন্য। দুয়েক দিনের মধ্যে তাদের একটি টিম চট্টগ্রামে আসবে। আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। তবে চট্টগ্রাম-৮ আসনে যেহেতু আমাদের প্রার্থী আছে, তাই আমরা এখানে প্রতিনিয়ত মানুষকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিতে উৎসাহিত করছি।

জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরী শাখার সেক্রেটারি ও চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন বলেন, আমরা প্রচার সপ্তাহ ঘোষণা করেছি। ঘরে ঘরে আমাদের নেতাকর্মীরা লিফলেট বিতরণ করছে। এছাড়া হাটে-বাজারে আমরা প্রতিদিন ক্যাম্পেইন করছি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান জানান, সরকার গণভোটের প্রচার নিয়ে যা করছে তা তামাশা। গণভোটের অনেকগুলো জায়গায় নোট অব ডিসেন্ট আছে। সরকার ‘হ্যাঁ’ কেন দিতে হবে সেটি বলছে, কিন্তু ‘না’-এর বিপরীতে কী আছে সেটি বলছে না। তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিতে বলতে পারে না। শুধু গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে পারে। তাই আমরা গণভোট নয়, আমাদের মূল নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত আছি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, জেলার প্রত্যেক উপজেলায় তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে গণভোট নিয়ে তৈরি করা ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করছি। সরকারি কর্মকর্তারা ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। ভোটের প্রচারের আগ পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন