চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে দেশীয় ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আসর 'আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা'র ১১৭তম আসরে আবারও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন কুমিল্লার শরীফ বলী প্রকাশ বাঘা শরীফ। শনিবার বিকেলে টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে ফাইনাল রাউন্ডে একই জেলার রাশেদ বলীকে পরাজিত করে টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। তবে রাশেদকে পরাজিত করতে ২৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের রুদ্ধশ্বাস এক মল্ল যুদ্ধে অংশ নিতে হয় বাঘা শরীফকে।
খেলা শেষে তাকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি তুলে দেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ানসহ আয়োজন কমিটির নেতৃবৃন্দ। এবারের আসরে রানার্স আপ হয়েছেন কুমিল্লা সদরের জগন্নাথপুর ইউনিয়নের মো. রাশেদ। আর তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন সাভারের সেনা সদস্য মিঠু্। গত বছর ১১৬ তম আসরে এই জুটি চ্যাম্পিয়ন ও রাসার্ন আপ হয়েছিলেন। ফলে এবারও ট্রফি দুটি কুমিল্লার ঘরে গেল।
শনিবার সকাল থেকেই জব্বারের বলী খেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘীর মাঠে দর্শকরা আসতে শুরু করেন। দুপুর ৩টা থেকে খেলা শুরু হবার কথা থাকলেও দুপুর ২টার আগে থেকেই খেলায় অংশ নেওয়া বলীরা মাঠে আসতে থাকেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই লালদিঘী মাঠের ৫ ফুট উচ্চতা, ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের ৩০০টি বাঁশ, কাঠ ও বালী দিয়ে তৈরি বিশেষ মঞ্চের দিকে নজর সবার।
একে একে রেফারিরা মঞ্চে উঠতে থাকেন। মঞ্চের নিচে তখন ব্যান্ড পার্টির ঢাকের বাজনা। ধারাভাষ্যকরের ঘোষণার পর শুরু হয় মল্লযুদ্ধ। এবারের বলী বা কুস্তি খেলতে রেজিস্ট্রেশন করেন ১০৮ জন বলী। প্রথম রাউন্ড পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন আটজন। এর মধ্যে ১০৮ জন থেকে বাচাই করা চারজন ও অতিতের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ হওয়া চারজনকে নেওয়া হয়। লটারির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ নির্ধারণের পর শুরু হয় আরও কঠিন লড়াই। সেখান থেকে চারজন জায়গা করে নেন সেমিফাইনালে।
প্রথম সেমিফাইনালে মিঠু বলীকে মাত্র দেড় মিনিটে হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন রাশেদ বলী। অন্য সেমিফাইনালে সাবেক চ্যাম্পিয়ন শাহজালাল বলীকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন বাঘা শরীফ। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াই চলে মিঠু বলী ও শাহজালাল বলীর মধ্যে। এই লড়াইয়ে দীর্ঘ ১৭ মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি খেলা শেষে জয় পান মিঠু বলী। তিনি একজন সেনা সদস্য।
বিকেল পাঁচটার পর ফাইনালে মুখোমুখি হন বাঘা শরীফ ও রাশেদ বলী। তারা মুখোমুখি হতেই মাঠজুড়ে দর্শকদের মাঝে চরম উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। টানা তিন আসর ধরে তারা একে অপরকে মোকাবিলা করছেন। প্রায় ২৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ডের লড়াইয়ে দুজনই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে শক্তি প্রদর্শন করেন।
টানটান উত্তেজনায় দর্শকরাও মেতে ওঠে আনন্দে। শেষ পর্যন্ত কুস্তি খেলায় অভিজ্ঞ বাঘা শরীফের কাছে হার মানতে হয় রাশেদকে। এর আগে কয়েক দফায় রাশেদ বাঘা শরীফকে মাটিতে ফেলে দিতে সক্ষম হয়। তবে বুক উপরে থাকায় জিততে পারেনি রাশেদ। এছাড়াও বাঘা শরীফও বেশ কয়েকবার রাশেদকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে মাটিতে লুটিয়ে দেন। শেষ দিকে খেলার চাল ঘুরিয়ে দেন বাঘা শরীফ। হঠাৎ করেই নতুন এক চাল দিয়ে রাশেদকে হার মানতে বাধ্য করান। তুমুল লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাঘা শরীফই জয়ের মালা নিজের করে নেন।
এ সময় বাঘা শরীফ বলেন, আমি টানা তৃতীয় বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। নিজ জেলাকে সম্মনিত করেতে পেরে আমি আনন্দিত। জীবনে যতো দিন বেঁচে থাকব কুস্তি খেলে যেতে চাই। জব্বারের বলীখেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া আমার ক্যারিয়ারের জন্য গৌরবের। রানার্স আপ হওয়া রাশেদ বলী জানান, প্রতিবারই তার প্রতিপক্ষ থাকেন বাঘা শরীফ। এটা তার জন্য আনন্দের। তারা দুজনে খেলার নিয়ম মেনে কৌশলে খেলতে অভ্যস্ত। এই খেলাকে শক্তির পাশাপাশি কৌশল ও দৃঢতার লড়াই বলে মনে করেন তিনি।
এবারের বলীখেলায় চ্যাম্পিয়নকে ট্রফি ও ৩৫ হাজার টাকা নগদ, রানার্স আপকে ট্রফি ও ৩০ হাজার টাকা নগদ ও তৃতীয় স্থান অধিকারীকে ট্রফি ও ২৫ হাজার টাকা নগদ প্রদান করা হয়। বলীখেলা পরিচালনা করেন আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব হাফিজুর রহমানসহ তিনজন রেফারি।
উৎসবমুখর লালদীঘি:
ঐতিহ্যবাহী আব্দুল জব্বারের বলীখেলা উপেলক্ষ্যে এবারও লালদিঘী পাড়ে বসেছে দুই কিলোমিটারব্যাপী মেলা। প্রতিবার ৩ দিনের মেলা হলেও এসএসসি পরীক্ষার কারণে এবার কমিয়ে সেটি দুদিন করা হয়। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলা খ্যাত এই জনসমাগমে গৃহস্থালি পণ্য, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, পোড়ামাটির তৈজসপত্র এবং বৈচিত্র্যময় খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। শুক্রবারের মতো শনিবারও মেলায় সকাল থেকে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বিকেল গড়িয়ে রাত পর্যন্ত বেচাকেনা আর মানুষের আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো লালদিঘী এলাকা।
উল্লেখ্য, ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুবকদের সম্পৃক্ত ও উৎসাহিত করতে এই কুস্তি খেলার আয়োজন করে। তার মৃত্যুর পর এই খেলা আব্দুল জব্বারের বলীখেলা হিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে এটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও লোকজ উৎসব হয়ে ওঠে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

