৫০০ শয্যার হাসপাতাল। অথচ ভর্তি থাকছেন ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ রোগী। প্রতিদিনই এভাবে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালকে। কোনো কোনো বিভাগে পরিস্থিতি আরো নাজুক। অতিরিক্ত রোগীর জন্য বরাদ্দ না থাকায় বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল, স্থান ও সরঞ্জামের সংকট দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের বিভিন্ন বারান্দা, লিফটের সামনে ও করিডরে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। এতে রোগী ও স্বজনদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলেও ভোগান্তি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে মেডিসিন, শিশু ও সার্জারি বিভাগে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন বিভাগের পুরুষদের জন্য অনুমোদিত শয্যা ৪৯টি। এর বিপরীতে বৃহস্পতিবার ভর্তি ছিলেন ২০৫ জন। নারীদের জন্যও অনুমোদিত শয্যা ৪৯; ভর্তি ছিলেন ১৫৩ জন। অর্থাৎ, নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ৯৮ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৫৬।
এদিকে বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ৩৫ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। এদিন নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরো ১১ জন। বেড়েছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। বুধবার হামের রোগী ভর্তি ছিলেন ৫৭ জন। বৃহস্পতিবার এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ জনে।
শিশু বিভাগেও পরিস্থিতি একই। ৫৪টি অনুমোদিত শয্যার বিপরীতে বৃহস্পতিবার ভর্তি ছিল ২৫৭ শিশু। এসব শিশুর মধ্যে জ্বর, নিউমোনিয়া, হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মিয়া মঞ্জুর বলেন, যেসব রোগীকে ভর্তি না করলেই নয়, মূলত তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে। অন্যদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। এরপরও অনুমোদিত শয্যার প্রায় পাঁচগুণ রোগী ভর্তি রয়েছেন।
লাকসামের মোজাফফরগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ফরিদ মিয়া বলেন, গত মঙ্গলবার জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছি। এখনো লিফটের সামনেই বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এত রোগী আগে কখনো দেখিনি। এ হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো দরকার। এভাবে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আমি আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছি।
চান্দিনা থেকে তিন বছরের মেয়ে তানজিনাকে নিয়ে হামের চিকিৎসা করাতে এসেছেন তাসলিমা আক্তার। তিনি বলেন, রোগীদের মধ্যে হাহাকার লেগে আছে। এত রোগী দেখে আমরা দিশাহারা হয়ে যাচ্ছি। বাচ্চাকে নিয়ে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি লেগেই আছে।
শুধু ভর্তি রোগী নয়, তাদের সঙ্গে থাকা স্বজন ও অ্যাটেনডেন্টদের কারণেও হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একজন রোগীর সঙ্গে অনেক সময় দু-তিনজন স্বজন থাকছেন। ফলে সীমিত জায়গায় রোগী ও স্বজনদের সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
হাসপাতালের বহির্বিভাগেও রোগীর চাপ কম নয়। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো না থাকায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জাবেদ আহমেদ বলেন, সুন্দর ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু চিকিৎসকদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না। কারণ, সীমিত সম্পদ ও জনবল দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। রোগীর সংখ্যা ও সেবার চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় জনবল ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
কুমেক হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. শাহজাহান বলেন, ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই।
কুমিল্লার বিশিষ্টজনরা বলছেন, রোগীর চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শয্যা, জনবল, অবকাঠামো ও চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানো না হলে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। প্রায় ৭০ লাখ মানুষের বসবাস ১৮ উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা জেলায় মাত্র ৫০০ শয্যার এই হাসপাতাল দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসা চাহিদা পূরণ করা কঠিন। এ কারণে কুমেক হাসপাতালকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


