চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর ভোরের অভিযান শুরুর আগেই বড় অংশের সন্ত্রাসীরা পাহাড়ি পথ ধরে সরে গেছে। এই এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. ইয়াছিন, রোকন মেম্বার ও গফুর অভিযানের আগেই সটকে পড়ে বলে জানান চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ।
তিনি বলেন, আমরা অভিযান সর্বোচ্চ গোপনীয়তার মধ্যেই করেছি। তবে পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি ও সন্ত্রাসীদের লোকাল নেটওয়ার্কের কারণে কিছু আগাম তথ্য তারা পেতে পারে। তাদের চক্র পুরোপুরি ভাঙতে আমাদের নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে। কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী আগেই সরে গেছে। কিন্তু তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে নয়।
সোমবার ভোর ৫টায় এ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৩,১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ৩টি হেলিকপ্টার, ১৫টি এপিসি, ১২টি ড্রোন এবং ডগ স্কোয়াড। যদিও অভিযানটি প্রাণহানির ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে এবং ১২ জনকে আটক করা হয়েছে, তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ধরা পড়েনি। স্থানীয়দের বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ার নড়াচড়া, পাহাড়ি লোকজনের আচরণ, ইউনিফর্মের অতিরিক্ত চলাচল এবং হেলিকপ্টারের শব্দ—সব মিলিয়ে তারা অভিযান শুরুর আগেই সতর্ক হয়ে গেছে।
মাঠ পর্যায়ের তদন্তে উঠে এসেছে অন্তত ১১টি সিগন্যাল যা সন্ত্রাসীদের আগাম সতর্ক করেছিল। প্রথম সিগন্যাল ছিল স্থানীয়দের চোখে পুলিশ ও এপিবিএনের অস্বাভাবিক ইউনিফর্ম আনাগোনা। অভিযান শুরুর আগের দিন বিকেল থেকে সলিমপুর ও বাঁশবাড়িয়া সড়কে অতিরিক্ত টহল ও যানবাহন চলাচল শুরু হয়। ফয়সাল আহমেদ নামে এক চায়ের দোকানদার জানান, সন্ধ্যার পর এত ইউনিফর্ম একসাথে আমি আগে দেখিনি। তখনই বুঝেছিলাম, বড় কিছু হতে যাচ্ছে। এর পরের সিগন্যাল ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। স্থানীয় ফেসবুক গ্রুপগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে পোস্টিং বেড়ে বা কমে যায়। কিছু গ্রুপে ‘বাহিরে পুলিশ দেখা যাচ্ছে’, ‘আজ রাতে পাহাড়ে যেও না’—ধরনের মন্তব্য উঠে আসে। শরিফুল ইসলাম নামে স্থানীয় যুবক বলেন, রাতে কয়েকজন পাহাড়ি ছেলে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে গেল। তখনই মনে হচ্ছিল, তারা আগাম সতর্ক হয়ে গেছে।
অভিযানের আগে একটি হেলিকপ্টার পাহাড়ের ওপর থেকে কয়েকবার চক্কর দেয়। স্থানীয় গফুর আলী নামে বয়স্ক গ্রামবাসী বলেন, এভাবে হেলিকপ্টার ঘুরি ঘুরি যাওয়াটা নতুন। তখনই মনে হইছিল, কিছু ঘটবে। এ ছাড়া রাতে রেশন বহনকারী গাড়িগুলো কয়েকবার পাহাড়ের দিকে যায়। স্থানীয়রা জানান, এটি সাধারণ দিনে ঘটে না। দোকানদাররা বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর রেশন গাড়িগুলো পাহাড়ের পাশে দেখেছি। তখনই ভয়ে সবাই দোকান বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া রাতের সময়ে পাহাড়ের রাখালরা অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত নিচে নেমে আসে, যা স্থানীয়দের চোখে বড় ঘটনা আসছে ইঙ্গিত দেয়। সাবেকুন্নাহার নামে এক গৃহবধূ বলেন, রাখালরা অন্যদের আগে বুঝে। সে দিনও তারা ভয়ে ছিল।
অভিযানের আগের রাতের অন্যান্য সতর্কবার্তা ছিল—এপিসি গাড়ির শব্দ দূর থেকেও শোনা যাওয়া, মোবাইল নেটওয়ার্কের ওঠানামা, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের আস্তানায় হঠাৎ আলো বন্ধ হয়ে যাওয়া। স্থানীয়রা বলেন, যেখানে রাতভর হাসাহাসি চলত, সেই রাতে একদম নিঃশব্দ ছিল। এছাড়া সন্ত্রাসীদের পাহাড়ের ‘ওয়াচার’রা অভিযান শুরুর আগের রাতেই অদৃশ্য হয়ে যায়। স্থানীয়রা জানান, এই ওয়াচাররা সাধারণত পাহাড়ে দাঁড়িয়ে নজরদারি করে, কিন্তু অভিযানের রাতে তারা ছিলেন না। খাবার–পানি বহনকারী গাইডরা চুপচাপ হয়ে যাওয়াও সন্ত্রাসীদের সতর্ক হওয়ার আরেকটি কারণ। সব মিলিয়ে, এলাকার পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি, স্থানীয় নেটওয়ার্ক এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো মিলিয়ে তারা আগেই বুঝতে পারে, বড় অভিযান আসছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ। তিনি বলেন, আমরা অভিযান সর্বোচ্চ গোপনীয়তার মধ্যেই করেছি। তবে পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি ও সন্ত্রাসীদের লোকাল নেটওয়ার্কের কারণে কিছু আগাম তথ্য তারা পেতে পারে। তাদের চক্র পুরোপুরি ভাঙতে আমাদের নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে। কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী আগেই সরে গেছে। কিন্তু তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে নয়। তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি এলাকায় সম্পূর্ণ গোপনভাবে চলা খুব কঠিন। কিছু শব্দ বা মানুষের চলাচলও তাদের সতর্ক করে দেয়।
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দিনও এ অভিযানকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের জায়গা। এবার আমরা পুরো চক্র ভাঙার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছি। কয়েকজন পালালেও অভিযান–পরবর্তী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। তারা ফিরে এসে আর সংগঠিত হতে পারবে না। তিনি আরও যোগ করেন, এলাকাবাসী যে আতঙ্কে ছিল, তা কমে এসেছে। আমরা তাদের পাশে আছি।
অভিযানে অংশ নেওয়া স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীরা আগেই পালিয়ে গেছে, তবে আমরা তাদের সবসময় নজরদারিতে রাখছি। উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, সিসি ক্যামেরা এবং বাইনোকুলারগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। এছাড়া অভিযান চলাকালে স্থানীয়রা লক্ষ্য করেছেন, পাহাড়ে হঠাৎ অস্বাভাবিক নীরবতা, চুপচাপ রাখা আস্তানা এবং আলো বন্ধ হওয়া—সবই সন্ত্রাসীদের সতর্কতার প্রমাণ। এক কৃষক বলেন, “ওরা আগে খবর পেয়ে পালায়। কিন্তু অভিযান না হলে আমরা রাতে ঘুমাতে পারতাম না। এখন অন্তত পুলিশ আছে।”
স্থানীয় এক দোকানদারও বলেছেন, আস্তানায় আগের রাতে আলো ছিল না। বুঝেছিলাম, ওরা পালিয়েছে। তবু অভিযান হওয়ায় ভালো হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, যদিও বড় অংশের সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান সফলভাবে চালিয়েছে এবং এলাকায় আবার শান্তি ফিরেছে। অভিযান শেষে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে দুইটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এটি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সন্ত্রাসীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার পথ বন্ধ করার জন্য নেওয়া পদক্ষেপ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, পাহাড়ি এলাকায় এমন অভিযান সবসময় চ্যালেঞ্জের। পাহাড়ের দিক-প্রকৃতি, লুকানো পথ এবং স্থানীয় নেটওয়ার্কের কারণে সন্ত্রাসীরা অনেক সময় আগেই খবর পেয়ে যায়। তবুও যৌথ বাহিনীর এই মেগা–অপারেশন একটি বড় সাফল্য। উদ্ধারকৃত ১২ জন আটক সন্ত্রাসী, আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় অস্ত্র, ককটেল এবং নজরদারি সরঞ্জাম থেকে বোঝা যাচ্ছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে অপরাধ চালাচ্ছিল।
এছাড়া স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই অভিযান তাদের রাতের ঘুমে স্বস্তি ফিরিয়ে দিয়েছে। ভোরের হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং এপিসি–এর শব্দে তারা আতঙ্কিত হলেও, নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত থাকায় বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। সাবেকুন্নাহার নামে এক গৃহবধূ বলেন, আমরা ভয়ে পাহাড় থেকে দূরে থাকতাম। এখন নিরাপত্তা বাহিনী আছে, আমাদের ভয় নেই।
অভিযান চলাকালীন সময়ে ডিআইজি মো.আহসান হাবীব পলাশ এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক সরেজমিনে উপস্থিত থেকে সার্বিক অভিযান তদারকি করেছেন। জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁনও উপস্থিত ছিলেন। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ি এলাকা চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে ১২ জনকে আটক করেছে এবং সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন স্থানে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, সিসি ক্যামেরা, ডিভিআর ও বাইনোকুলার উদ্ধার করেছে।
ডিআইজি আরও বলেছেন, এ ধরনের অভিযানে আগাম সতর্কবার্তা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সন্ত্রাসীদের চক্র ভেঙে দেওয়া আমাদের প্রধান লক্ষ্য। তারা পালালেও নজরদারি অব্যাহত থাকবে। বিভাগীয় কমিশনার বলেন, এই অভিযান এলাকা থেকে দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসী দখল ও আতঙ্ক দূর করতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাইনি, স্থানীয় মানুষ আতঙ্কিত হোক। অভিযানের পর স্থায়ী নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, পাহাড়ে অভিযানের দিন সকাল থেকেই অস্বাভাবিক নীরবতা ছিল। কুকুরের ডাক, সাধারণ মানুষের চলাচল, পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের হুলস্থুল সব হঠাৎ কমে যায়। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সন্ত্রাসীদের সতর্ক করে। যদিও তারা আগেই পালিয়ে গেছে, উদ্ধারকৃত আলামত এবং অভিযান পরবর্তী স্থায়ী ক্যাম্পের মাধ্যমে তাদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
তল্লাশিকালে উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে ২টি আগ্নেয়াস্ত্র (একটি পিস্তল ও একটি এলজি), ৪টি কার্তুজ, ১১টি ককটেল বিস্ফোরক, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ১৯টি সিসি ক্যামেরা, ২টি ডিভিআর, ১টি পাওয়ার বক্স এবং ২টি বাইনোকুলার। এই সরঞ্জামগুলো স্থানীয় নজরদারি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

