কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কুমিল্লার গবাদিপশুর খামারগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। ভারতীয় গরু প্রবেশ বন্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ও সীমান্তে নজরদারি জোরদার হওয়ায় এবার ন্যায্যমূল্য পাওয়ার আশা করছেন স্থানীয় তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশি পশু দিয়েই এবার কুমিল্লাসহ আশপাশের জেলার চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। তবে মহাসড়কে গরু বোঝাই ট্রাকে চাঁদাবাজি ও ছিনতাই আতঙ্ক দেখা গেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার ১৭ উপজেলায় এবার কোরবানির জন্য মোট দুই লাখ ৫৯ হাজার ৭৫২ গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। এর বিপরীতে চাহিদা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৬, যা চাহিদার তুলনায় প্রায় ১২ হাজার ৩০০ বেশি ।
এবারের কোরবানির জন্য এক লাখ ৯৮ হাজার ৯৬৯টি গরু, এক হাজার ৭৮৪ মহিষ, ৫৪ হাজার ৮৫২ ছাগল, তিন হাজার ২৩৫ ভেড়া এবং ১৯৬টি অন্যান্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, এবার জেলার চাহিদা পূরণ করেও অতিরিক্ত পশু অন্য জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
খামারিরা জানান, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে তারা প্রাকৃতিক উপায়ে গরু, ছাগল ও ভেড়া মোটাতাজাকরণ করছেন। দেশি জাতের পাশাপাশি ব্রাহমা, ফ্রিজিয়ান ও শাহিওয়াল জাতের গরুও এবার হাটে উঠবে। অনেক খামারি এক লাখ থেকে শুরু করে ২০ লাখ টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছেন।
গরু ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের জানান, গত সপ্তাহে মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম এলাকায় ১০টি গরু ডাকাতরা নিয়ে গেছে । আমরা আতঙ্কে থাকি । পর্যাপ্ত পুলিশ মহাসড়কে দেখা যাচ্ছে না । একটি ট্রাকে ২০ থেকে ৩০টি গরু নিয়ে ঢাকায় যাই । যার বাজার মূল্য ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চাই ।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার বদরপুর এলাকার জাফরিন এগ্রো ফার্মের মালিক জামাল হোসেন বলেন, দেশি-বিদেশি জাতের ১৪০টি গরু আছে আমার খামারে। ভুট্টা, ভুসি, খড় ও ঘাস ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানো হয়নি। ইতোমধ্যে ৩০টি বিক্রি করেছি। মাংসের দাম বেশি হওয়ায় এবার গরুর দাম একটু বেশি।
দেবিদ্বারের ফুলতলি গ্রামের বিল্লাল হোসেন বলেন, আমরা লাভের আশায় গরু পালন করি। কিন্তু চোরাই পথে ভারতীয় গরু এলে বাজার ভেঙে যায়। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, সীমান্ত দিয়ে যেন কোনো গরু ঢুকতে না পারে।
জানা গেছে, জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পশু রয়েছে মুরাদনগরে ২১ হাজার ৬৭৬টি। এছাড়া আদর্শ সদরে ২০ হাজার ৯২৩, বুড়িচংয়ে ১৮ হাজার ৫৯৪, বরুড়ায় ১৭ হাজার ৬৪৭, নাঙ্গলকোটে ১৭ হাজার ৩৫৩ এবং চৌদ্দগ্রামে ১৬ হাজার ৯০৮টি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি গবাদিপশু রয়েছে লাকসামে। সেখানে চাহিদার তুলনায় প্রায় সাত হাজার ৮৭৮টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সামছুল আলম বলেন, কুমিল্লায় এবার কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। চাহিদার অতিরিক্ত পশু ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা যাবে। দেশি পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ সম্ভব। তিনি আরো জানান, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ভারত থেকে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা-১০ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ভারতীয় গরু প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো অবস্থাতেই সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকতে দেওয়া হবে না। সম্ভাব্য রুটগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রেজা হাসান বলেন, সীমান্তের ১০৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে আট কিলোমিটার পর্যন্ত টহল জোরদার করা হয়েছে। বাজার মনিটরিংয়ে প্রতিদিন টাস্কফোর্স কাজ করবে। এবার কুমিল্লায় ৪৩০টি স্থায়ী-অস্থায়ী পশুর হাট বসছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জালটাকা প্রতিরোধে ইতোমধ্যে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাজার মনিটরিংয়ের জন্য প্রতিদিন দুটি টাস্কফোর্স মাঠে কাজ করবে। পাশাপাশি মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই ঠেকাতে জেলা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ও হাইওয়ে কুমিল্লা সুপার শাহিনুর আলম আমার দেশকে বলেন, মহাসড়কে গরু বোঝাই ট্রাকে চাঁদাবাজি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এজন্য ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত পুলিশ চাওয়া হয়েছে। মহাসড়কে দিনের চেয়ে রাতে অতিরিক্ত পুলিশের টহল থাকবে ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ক্রমবর্ধমান শক্তিধর চীন সফরে ইরান যুদ্ধে দুর্বল ট্রাম্প