চোখের সামনে আগুন, তবু পৌঁছাতে পারে না ফায়ার সার্ভিস

উপজেলা প্রতিনিধি, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

চোখের সামনে আগুন, তবু পৌঁছাতে পারে না ফায়ার সার্ভিস
ছবি: আমার দেশ

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার সীতাকুণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছে এক গুরুতর পরিকল্পনাগত ত্রুটি। জরুরি মুহূর্তে চোখের সামনে অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না ফায়ার সার্ভিস। এতে মানুষের জীবন, বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সীতাকুণ্ড পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ঠিক সামনেই রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের স্থায়ী ডিভাইডার। কিন্তু জরুরি যানবাহনের জন্য সেখানে কোনো বিশেষ ক্রসিং, ইমার্জেন্সি পকেট গেট কিংবা ইউ-টার্নের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

ফলে মহাসড়কের বিপরীত পাশে কোনো অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো জরুরি ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সরাসরি সেখানে যেতে পারে না। বাধ্য হয়ে কখনো অনেক দূর ঘুরে যেতে হয়, আবার কখনো ঝুঁকি নিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালাতে হয়। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফায়ার সার্ভিস স্টেশনটি মহাসড়কের পূর্ব পাশে চট্টগ্রামমুখী লেনে অবস্থিত। বিপরীত পাশে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, পুরোনো বাজার, অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ছোট-বড় শিল্পকারখানা। অথচ জরুরি পরিস্থিতিতে সেখানে দ্রুত পৌঁছানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এটি শুধু একটি নকশাগত ত্রুটি নয়, বরং জননিরাপত্তার বিষয়ে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। তারা বলছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার সামনে জরুরি প্রবেশপথ না থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অগ্নি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম ৫ থেকে ১০ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু সীতাকুণ্ডে এই অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক সময় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন। তিনি আমার দেশকে বলেন, ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনের ডিভাইডারের কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে বিলম্ব হচ্ছে। বিপরীত পাশে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে গাড়িগুলোকে অনেক দূর ঘুরে যেতে হয়।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানের সামনে বিশেষ ইউ-টার্ন বা ইমার্জেন্সি পকেট গেট থাকা উচিত। কিন্তু সীতাকুণ্ডে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, সমস্যাটির সমাধান খুবই সহজ। সড়ক ও জনপথ বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনের ডিভাইডারের একটি অংশে নিয়ন্ত্রিত ইমার্জেন্সি পকেট গেট নির্মাণ করা যেতে পারে।

তাদের মতে, এই গেট শুধুমাত্র ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি যানবাহনের জন্য ব্যবহার করা হবে। এতে সাধারণ যান চলাচলেও কোনো সমস্যা হবে না।

সচেতন মহলের ভাষ্য, সামান্য একটি অবকাঠামোগত সংশোধনই হাজারো মানুষের জীবন ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করতে পারে। কারণ, বিপদের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা ফায়ার সার্ভিস। অথচ সেই সংস্থাই যদি পরিকল্পনার ত্রুটিতে আটকে যায়, তাহলে তা শুধু একটি সড়ক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, বরং নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার পরিচয় বহন করে।

প্রশ্ন এখন একটাই, আর কত দিন এভাবে চলবে, বড় কোনো দুর্ঘটনার পর কি নড়বে কর্তৃপক্ষ, নাকি তার আগেই নেওয়া হবে কার্যকর উদ্যোগ।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন