লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ কুমিল্লা, গ্রামের মানুষের ভোগান্তি চরমে

এম হাসান, কুমিল্লা

লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ কুমিল্লা, গ্রামের মানুষের ভোগান্তি চরমে
তীব্র গরমে হাঁসফাঁস স্কুল শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। একটুখানি স্বস্তির আশায় পানিতে নেমে সাঁতার কাটছে শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগর দিঘি থেকে বুধবার তোলা। ছবি: আমার দেশ

তীব্র লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে কুমিল্লার মানুষ। দিনের পর দিন বিদ্যুদ্বিভ্রাটে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকাগুলোর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় সেখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিশু ও বয়স্করা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও।

নগরীতে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। তবে গ্রামীণ এলাকাগুলোয় এই সময়সীমা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি খাতও। সেচ পাম্প চালাতে না পারায় জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

বিজ্ঞাপন

গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লা নগরী ঘুরে দেখা গেছে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। জীবিকার তাগিদে তীব্র রোদে কাজ করতে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। বাইরে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ কেউ ছায়া খুঁজছেন, কেউ পান করছেন ঠান্ডা শরবত। কেউ সামান্য স্বস্তির আশায় পুকুরে নেমে শরীর ভেজাচ্ছেন।

জীবিকার তাগিদে তীব্র রোদের মধ্যে রিকশা চালাচ্ছেন রংপুর থেকে কুমিল্লা নগরীতে আসা রহিম মিয়া। ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। রহিম মিয়া বলেন, কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড গরম পড়ছে। একবেলা রিকশা চালালে আরেক বেলা চালাতে পারি না। শরীর সইতে চায় না। এই মাসে বাসাভাড়া, খাওয়া-দাওয়া করে বাড়িতে কিছুই পাঠাতে পারব না।

গ্রামীণ এলাকায় দিনের সিংহভাগ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছেন মানুষ। অনেক এলাকায় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টানা ৮ ঘণ্টায় একবারও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। অন্য সময়ও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা থাকছে না। লোডশেডিংয়ের কারণে আইপিএস চার্জ করাও সম্ভব হচ্ছে না।

কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এমতাবস্থায় বেশি বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। রাতের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরো বেশি।

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ধামঘর গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী সানজিদা আক্তার বলেন, আগে আমরা টানা কয়েক ঘণ্টা পড়াশোনা করলেও ক্লান্তি আসত না। এখন তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে দুই ঘণ্টাও পড়তে পারি না। সারা দিন তো বিদ্যুৎ থাকেই না, রাতেও থাকে না বেশির ভাগ সময়। ঠিকমতো ঘুম হয় না, পড়াশোনাও হয় না। আমাদের পড়াশোনার কথা বিবেচনা করে হলেও লোডশেডিং কমানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন করছি।

এছাড়া গ্রামীণ ক্লিনিক ও ফার্মেসিগুলোতেও বিদ্যুৎ না থাকায় ওষুধ সংরক্ষণ এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঠান্ডা তাপমাত্রানির্ভর গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও টিকা সংরক্ষণে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাজারে দোকান খোলা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ, ফ্যান ও আলোর অভাবে ক্রেতা কমে গেছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং তাদের দৈনিক আয় কমে যাচ্ছে।

কুমিল্লার আভিজাত্য হোটেল রেড রুফ ইন এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর অসীম কুমার সাহা বলেন, আগের তুলনায় এখন গ্রাহক কমে গেছে। মানুষ গরমের কারণে বাসা থেকে বের হতে চায় না। তাই আমাদের বেচাবিক্রি কমে গেছে।

কুমিল্লা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী দিলীপ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন, ৮-১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দিতেই হয়। বাকি সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ রাখার চেষ্টা করি। সেচের জন্য রাত ১১টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ দেওয়ার সরকারি নির্দেশনা দেওয়া আছে। এ সময় আমরা লোডশেডিং না দেওয়ার চেষ্টা করি।

পিডিবি কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম বলেন, এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা পাচ্ছি মাত্র এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রয়োজনীয় এলাকাগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। শহরের বেশির ভাগ বিদ্যুৎ সরাসরি ত্রিপুরা থেকে আসে, এজন্য সেখানে লোডশেডিং তুলনামূলক কম।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ এপ্রিল বেলা ১১টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট, আর উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...