রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) ভিসি ড. আতিয়ার রহমান এবং পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের উপপরিচালক (পিডি) আব্দুল গফুর প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন। এরই জের ধরে আব্দুল গফুরকে ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে। নজিরবিহীনভাবে তার অফিস সিলগালা এবং ব্যবহৃত গাড়িটি হারিয়ে গেছে বলে জিডি করে জব্দ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসব নিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে মন্ত্রণালয়সহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভিসি ও পিডি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ৭ জানুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আয়োজিত শোকসভায় ভিসি ড. আতিয়ার রহমান ও প্রকল্প পরিচালক আব্দুল গফুরের মধ্যে প্রকাশ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। এর আগে থেকেই দুই কর্মকর্তার মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। কিন্তু ওই দিনই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। একপর্যায়ে একজন সাংবাদিকের সঙ্গে আব্দুল গফুরের একটি ব্যক্তিগত ফোনালাপ সাউন্ড সিস্টেমে বাজিয়ে শোনান উপাচার্য। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শোকসভাটিই পন্ড হয়ে যায়।
ওই দিন রাতেই ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত এক আদেশে আব্দুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে বলা হয়, রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, আইসিটি সংশ্লিষ্ট অপরাধ, প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুন্নের অভিযোগ রয়েছে। বরখাস্তকালীন নজিরবিহীনভাবে তাকে ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জুনাইদ কবিরের স্বাক্ষরিত আরেকটি অফিস আদেশে উপাচার্যকে উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।
একই সময়ে কোনো নোটিশ বা অফিস আদেশ ছাড়াই পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের কার্যালয় সিলগালা করা হয়। এছাড়া থানায় হারানো জিডি করে পুলিশ দিয়ে পিডির বাসার সামনে থেকে পুলিশ দিয়ে তার ব্যবহৃত সরকারি গাড়ি জব্দ করে নিয়ে আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে থানায় পাল্টা অভিযোগও দায়ের করেন পিডি আব্দুল গফুর।
বিষয়টি নিয়ে বর্তমান উপাচার্য ও বরখাস্ত হওয়া পিডি একে অন্যকে অভিযুক্ত করে ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত অভিযোগও করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে অভিযোগে আব্দুল গফুরের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয়েছে। আর আব্দুল গফুর নিজেকে সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা দাবি করে ভিসির বিরুদ্ধে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন, যা নিয়ে বিব্রত খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইজিসিও।
আব্দুল গফুর জানান, শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে দুর্নীতি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সেচ্ছাচারিতাসহ উপাচার্য আতিয়ার রহমানের অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণেই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন তিনি। তার দাবি, মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন প্রকল্প পরিচালককে বহিষ্কার করার ক্ষমতা ভিসির নেই। কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এসব বিষয়ে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান জানান, আব্দুল গফুর একজন আপাদমস্তক দুর্নীতিবাজ। উন্নয়ন ও ওয়ার্কস বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং একটি প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত পিডি। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি স্থায়ী পিডি হতে চান। এতে ব্যর্থ হয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কারণে রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। উপাচার্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কাউকে বরখাস্ত করার সুযোগ নেই। দুটি থার্ড ডিভিশন থাকা সত্ত্বেও ডেপুটি ডিরেক্টর পদে কীভাবে চাকরি পেয়েছেন এই অভিযোগসহ আরো বেশ কিছু নতুন অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। নতুন অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলমান কাজগুলো চালু রাখার স্বার্থে উন্নয়ন ও ওয়ার্কস বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টরের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপাচার্যর ওপর। তবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব কাউকে দেওয়া হয়নি। খুব শিগগিরি নতুন পিডি নিয়োগ দিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এদিকে শীর্ষ দুই কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় পুরো ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ-গ্রুপিং থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা প্রকাশ্যে আসাটা অস্বাভাবিক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

