আওয়ামী লীগ নেতা হয়েও কক্সবাজারের বিএনপি নেতাদের যোগসাজশে ভূমিদস্যুতা ও জুলুম-জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছেন আরএফ বিল্ডার্স ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেলোয়ার হোসেন ওরফে হাজি দেলোয়ার। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা।
অভিযোগ উঠেছে, তিনি কক্সবাজার শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভূমি ও আবাসন প্রকল্প উন্নয়নের নামে জমি দখল, ফ্ল্যাট বিক্রির নামে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি না দিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি এবং মাস্তান ভাড়া করে জমি জবরদখল করেন।
সংবাদ সম্মেলন ডেকে এমনই এক অভিযোগ তুলেছেন কক্সবাজার শহরের উত্তর বাহারছড়ার বাসিন্দা ও স্থানীয় মৃত আবদুল হাকিমের ছেলে মুজিবুর রহমান মিল্টন। তার অভিযোগ, আরএফ বিল্ডার্স নামের ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাজি দেলোয়ার ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আহমেদ শফিক শহরতলির কলাতলী ভাঙ্গারমুখ এলাকায় তাদের একটি জমি উন্নয়নের শর্তে তার বাবা আবদুল হাকিমের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু আরএফ বিল্ডার্স বিগত ১৫ বছরেও সেই চুক্তির শর্ত পূরণ না করে উল্টো নানাভাবে তাদের হয়রানি করে যাচ্ছে।
মুজিবের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও জুলুম করে গেছেন।
তার অভিযোগ, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কক্সবাজার জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের মাঝারি পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সহায়তা নিয়ে মৃত আবদুল হাকিম ও তার ওয়ারিশদের জমি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি ভূমিদস্যু গ্রুপের কাছে বিক্রির চেষ্টা করছেন আরএফ বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান আহমেদ শফিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাজি দেলোয়ার। তিনি বলেন, জমি আমাদের, কিন্তু গোপনে সেই জমি বিক্রি করার চেষ্টা করছেন হাজি দেলোয়ার। আমরা জানতে পেরেছি, ইতোমধ্যে তিনি আওয়ামী লীগের ওই ভূমিদস্যু গ্রুপের কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকা নিয়ে নিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে আমাদের জমিতেই স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করছেন।
মুজিবুর রহমান দাবি করেন, ওই জমিতে নির্মাণকাজে বাধা দিতে গেলে তাদের মারধর ও প্রাণে মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছেন দেলোয়ার।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ারের মালিকানাধীন আরএফ বিল্ডার্সের কক্সবাজার শহরেই পাঁচটি প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া মহেশখালী উপজেলাসহ একাধিক উপজেলায় তাদের প্রকল্প রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়নের নামে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এসব প্রকল্পের একটিও বিগত ২০ বছরে শেষ করতে পারেনি আরএফ বিল্ডার্স। বরং এসব প্রকল্পের ফ্ল্যাট বিক্রি ও প্রকল্প দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
কী অভিযোগ যুবক মুজিবের
কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা মুজিবুর রহমান মিল্টন গত বুধবার বিকালে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। তাতে হাজি দেলোয়ার ও তার প্রতিষ্ঠানের অন্যায়, জুলুম, জালিয়াতি ও ভূমিদস্যুতার নানা অভিযোগ তুলে ধরেন।
মুজিব বলেন, আমার বাবা মৃত আবদুল হাকিম কক্সবাজার শহরতলির ঝিলংজা মৌজার কলাতলী ভাঙ্গার মুখ এলাকার স্যাম্পান হোটেলের পূর্ব ও দক্ষিণে ৭৫ শতক জমি কিনেছিলেন। ১৯৯৪ সালে কেনা সেই জমিতে ঘর নির্মাণ ও সাইনবোর্ড স্থাপন করেন এবং নিজের নামে খতিয়ান তৈরি করেন। পরে মেরিন ড্রাইভের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলে আমার বাবা আবদুল হাকিম ওই জমি থেকে ১০ শতাংশের ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারি অর্থও গ্রহণ করেন।
মুজিবের দাবি, মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের পর জমির মূল্যবৃদ্ধি পেলে পার্শ্ববর্তী শামসুল ইসলাম ও তার স্ত্রী কোহিনুর আরা বেগম এবং তাদের ছেলেরা লোভের বশবর্তী হয়ে বারবার তাদের জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ ও ঠেলাঠেলি শুরু করেন। ওই সময় তার বাবা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন, যা সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ওই মামলায় বিচারিক আদালত বিরোধপূর্ণ জমিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন না করতে ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) বা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যা এখনো বহাল আছে।
এদিকে ওই মামলায় বিবাদী হয়ে শামসুল ইসলাম ও কোহিনুর বেগম তৎকালীন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) বিডি মিত্রের স্ত্রী রাখি চৌধুরী এবং তার ঘনিষ্ঠ আলমগীর ভূঁইয়া গংকে ‘ঘুস হিসেবে’ জমির চারটি দাগের দুই দাগে প্রায় স্বত্বহীন জমি বিক্রি করেন। পরে বিডি মিত্রের প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তারা সামান্য কিছু জমির সিকস্তি ও অধিগ্রহণের অজুহাত তুলে আবদুল হাকিমের বৈধ সম্পূর্ণ খতিয়ান বাতিল করেন। এই ঘটনায় আবদুল হাকিম দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নেন।
অন্যদিকে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ছত্রছায়ায় ও রাজনৈতিক সহযোগিতায়’ তারা সেই জমি জবরদখল করে নেয়। এই ঘটনায় তাদের সহযোগী হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন ফ্যাসিবাদের চিহ্নিত সুবিধাভোগী আরএফ বিল্ডার্সের মালিক ‘ভূমিদস্যু’ হাজি দেলোয়ার, আহমেদ শফি এবং দুই ছেলে ফারুক ও ফয়সাল। পরে সেই জমিতে আরএফ বিল্ডার্স বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাইলে আবদুল হাকিম বাধা দেন এবং একই সঙ্গে এডিএম কোর্টে ফৌজদারি মামলা করেন। আদালত প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি এবং পরে জমির ওপরে ১৪৫ ধারা জারি করলে আরএফ বিল্ডার্স কর্তৃপক্ষ আইনি বিপাকে পড়ে প্রতারণার আশ্রয় নেন।
জমির উত্তরাধিকারী মুজিবুর রহমান বলেন, আরএফ বিল্ডার্স ও হাজি দেলোয়ার সাময়িকভাবে আমাদের আইনি ও প্রশাসনিক বাধা এড়াতে আমার বাবার নামজারি করা ১৯.১৭ শতক জমি থেকে ১৪ শতাংশ জমির জন্য ২০ লাখ টাকা অগ্রিম বিনিময়ে আমাদের সঙ্গে জমি কেনার একটি ‘নোটারি চুক্তি’ করেন এবং ভবনের কাজ শুরু করেন। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয়, তারা আসলে জমি ক্রয়ের জন্য নয় বরং তৎকালীন আইনি বাধা এড়াতেই প্রতারণামূলক নোটারি চুক্তির এই নাটক সাজান। মৌখিক এবং লিখিত চুক্তি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ না নিয়ে তারা ভবনের সেমি বেজমেন্ট করে। পরবর্তী সময়ে আমার বাবার বাধা এবং আদালতের ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) বহাল থাকায় দীর্ঘ ১৫ বছর প্রকল্পটির কাজ বন্ধ থাকে।
তিনি দাবি করেন, আদালতে বিচারাধীন ও জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি নেতাকর্মীদের টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করে আওয়ামী চক্রের সঙ্গে আড়াই কোটি টাকার নোটারি বায়না এবং আবারও সেই জমিতে বহুতল ভবনের কাজ শুরু করতে উঠে পড়ে লেগেছে সাতকানিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা হাজি দেলোয়ার, আহমেদ শফি এবং তার দুই ছেলে ছাত্রলীগ নেতা ফারুক ও ফয়সাল।
এ বিষয়ে মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না এবং স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তিনি দাবি করছেন, আওয়ামী লীগ নেতা হাজি দেলোয়ারের এই অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধে কক্সবাজার পুলিশ সুপার, কক্সবাজার সদর মডেল থানা, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। এ বিষয়ে কথা বলতে আরএফ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেলোয়ার হোসেন ওরফে হাজি দেলোয়ারের মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ ব্যাপারে আরএফ বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান আহমেদ শফিক বলেন, এটা সিম্পল ব্যাপার। আমাদের সঙ্গে আবদুল হাকিমের চুক্তি হয়েছিল। আমরা টাকাও দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে জানতে পারি, সেখানে তাদের কোনো জমি নেই। কিছু পেমেন্ট বাকি ছিল। তিনি বলেন, আমরা বড় বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করি। সেখানে যাচাই-বাছাই না করে কোনো প্রকল্প শুরু করি না। প্ল্যান পাস থেকে সব ধরনের অনুমতি নিতে হয়। সেখানে জমির মালিকানা ঠিক না থাকলে কীভাবে অনুমোদন মিলবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


