আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

প্রাকৃতিক সম্পদ-সৌন্দর্য আর নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের মিলনস্থল বান্দরবান

মো. আবুল বাশার নয়ন, বান্দরবান

প্রাকৃতিক সম্পদ-সৌন্দর্য আর নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের মিলনস্থল বান্দরবান
বান্দরবানের অনুপম নৈসর্গিক সৌন্দর্য। আমার দেশ

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা বান্দরবান অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ এসে ধরা দেয় মানুষের হাতে! এখানকার সুউচ্চ পাহাড়ের বসবাসকারী জনপদ যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি এই জনপদকে আরো বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।

মার্মা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যাসহ ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আবাসস্থল এই বান্দরবান। পাহাড়ের ঢালে তাদের ‘জুম’ চাষ পদ্ধতি কেবল কৃষিকাজ নয়; বরং জীবন সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জুমের ধান, ভুট্টা আর পাহড়ি শাকসবজির ঘ্রাণে মুখরিত থাকে পাহাড়গুলো। তাদের হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র আর বিন্নি চালের পিঠার স্বাদ পর্যটকদের দেয় এক আদি ও অকৃত্রিম অভিজ্ঞতা।

বিজ্ঞাপন

বান্দরবানের নামকরণের পেছনে রয়েছে এক আকর্ষণীয় লোকগাঁথা। মার্মা ভাষায় এর আদি নাম ‘ম্যাঅকছি ছড়া’। ‘ম্যাঅক’ অর্থ বানর আর ‘ছি’ অর্থ বাঁধ। কথিত আছেÑ এক সময় শহরের প্রবেশমুখে পাহাড়ি ছড়ায় অসংখ্য বানর লবণ খেতে আসত। প্রবল বর্ষায় ছড়ার পানি বেড়ে গেলে বানরের দল একে অপরের হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে বাঁধ তৈরি করে ছড়া পার হতো। বানরের সেই ছড়া পারাপারের দৃশ্য থেকেই এলাকাটি ‘বান্দরবান’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বান্দরবানের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে ‘বোমাং সার্কেল’। ১৯০০ সালের চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন অনুযায়ী এই এলাকাটি বোমাং রাজার শাসনাধীন ছিল। ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে বান্দরবানের আত্মপ্রকাশ হয়। তবে আজও সগৌরবে টিকে আছে শত বছরের পুরোনো বোমাং রাজবাড়ি। এখানকার ঐতিহ্যবাহী ‘রাজ পুণ্যাহ’ উৎসব আজও এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন বহন করে।

বান্দরবানকে বলা হয় ‘বাংলাদেশের ছাদ’। দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিনডং ও কেওক্রাডং এখানেই অবস্থিত। শুধু পাহাড় নয়, এটি ঝর্ণারও রাজ্য। জাদিপাই, নাফাখুম আর অমিয়াখুমের শীতল জলধারা পর্যটকদের ক্লান্তি মুছে দেয় নিমিষেই। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর স্বচ্ছ পানি পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলে আপন ছন্দে। নীলগিরি বা নীলাচলের মেঘের সমুদ্র আর আধ্যাত্মিক প্রশান্তির জন্য ‘বুদ্ধ ধাতু জাদী’ বা স্বর্ণমন্দির পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। রহস্যময় বগা লেকের নীল জল দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

প্রাকৃতিক সম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডার এই জেলা। দিগন্তজোড়া গহিন অরণ্য থেকে আহরিত সেগুন, গামারি, গর্জন আর শীল কড়ইয়ের প্রধান বিপণন পথ হিসেবে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী যুগ যুগ ধরে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া, পাহাড়ের উর্বর মাটিতে প্রচুর পরিমাণে আনারস, কলা, পেঁপে, কমলা ও লেবু উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে এখানকার সাদা, লাল ও কালো তিন রঙের বিন্নি চাল আর সুস্বাদু ভুট্টা পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় খাবার।

পাহাড়ের চূড়ায় যেখানে মেঘেরা বিশ্রাম নেয়, সেখানে পাহাড়ি মানুষের অকৃত্রিম আতিথেয়তা আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বান্দরবানকে করেছে অনন্য। এটি কেবল একটি জেলা নয়; বরং প্রকৃতি আর বিচিত্র নৃতাত্ত্বিক সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...