একটি শিশু ধর্ষিত হয়। মামলা হয়। আসামি গ্রেপ্তার হয়। তারপর বছর কাটে। হাজির হয় না সাক্ষী। ডিএনএ রিপোর্ট আসে না। শেষ পর্যন্ত সামাজিক চাপে মাথানত করে পরিবার । মামলাটি ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। বিচারের আশা হয় সুদূরপরাহত। চট্টগ্রামে ২০১৫ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত এক দশকে শিশু ধর্ষণের মামলার সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। অথচ এ মামলাগুলোর অধিকাংশেরই কোনো চূড়ান্ত বিচার হয়নি। শুধু নথির স্তূপ জমেছে, থানার রেজিস্টারের সংখ্যা বেড়েছে। আর ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যে বেড়েছে দীর্ঘশ্বাস ও হতাশা।
থানা ও আদালতের নথি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম নগরীর ১৬ থানায় ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলা হয়েছিল ৭৮টি। মাত্র চার বছরের মধ্যে সে সংখ্যা তিনগুণ ছাড়িয়ে ২০১৯ সালের প্রথম ১১ মাসেই দাঁড়ায় ২২৭টিতে। এছাড়া ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে দ্বিগুণ। এসব মামলার ভুক্তভোগীদের প্রায় ৬৪ শতাংশই শিশু ও কিশোরী, যাদের বয়স মাত্র চার থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।
জাতীয় পরিসংখ্যান আরো নির্মম সত্য বলছে। সরকারের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের করা চার হাজার ৫৪১ ধর্ষণ মামলার মধ্যে বিচার হয়েছে মাত্র ৬০টির। বাকি ৭৩ শতাংশ মামলা এখনো ঝুলে আছে। মামলাগুলা বছরের পর বছর নিষ্পত্তিহীন।
এমনকি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি ধর্ষণ মামলা তদন্ত করেছে। তাদের নিজস্ব প্রতিবেদনেই স্বীকার করা হয়েছে, ৪৪ শতাংশ মামলা তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রমাণিত না হওয়া মামলাগুলোর অন্তত ৩০ শতাংশই আসল ঘটনা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে বা তদন্তের অদক্ষতায় প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
আলোচিত পাঁচ মামলা
২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম শহরে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্ত লক্ষণ দাশ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক নওশের কোরেশি। যিনি বর্তমানে থানার সেকেন্ড অফিসার। তিনি জানান, তিন মাস আগে তারা অনেক জটিলতা মোকাবিলা করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করতে সক্ষম হন।
কেন এত দেরি হলো—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য চার্জশিট দিতে এতদিন লেগেছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করেছিলাম, কিন্তু রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেতেও অনেক সময় লেগেছে। এসব কারণে অভিযোগপত্র দাখিল বিলম্বিত হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম আদালত সবে মামলাটির চার্জ গঠন করেছে। অর্থাৎ, ঘটনা ঘটার চার বছর পরও মামলার বিচারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো ।
চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকার ১৪ বছর বয়সি গৃহকর্মী রহিমা আক্তার ২০১৯ সালের ২২ জুলাই নিজের কর্মস্থলেই ধর্ষণের শিকার হয়। অভিযুক্ত একজন এনজিও কর্মকর্তা, যিনি রহিমাকে বাসায় আটকে রেখে এই অপরাধ ঘটান। মামলা হয়েছিল। আসামি শনাক্ত ছিলেন। তবুও ছয় বছর পরও বিভিন্ন সংস্থাকে সংবাদ সম্মেলন করে এ মামলার বিচারের দাবি তুলতে হচ্ছে। রহিমার পরিবার এখনো অপেক্ষায়।
২০১৯ সালের আরেকটি ঘটনা। বায়েজিদের পাঁচ বছরের কন্যাশিশু। তার বাবা রিকশাচালক। মা মানুষের বাসায় কাজ করেন। কাছে মাঠে খেলতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। স্থানীয়রা নির্মল চন্দ্র নামে এক ব্যক্তিকে সন্দেহে ধরে পুলিশে দেয়। কিন্তু তদন্তের পর পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে লিখল, ‘শিশুটি ধর্ষিত হয়েছে সত্য, তবে নির্মল চন্দ্র জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।’
প্রকৃত সন্দেহভাজন বেলাল হোসেন, যিনি এলাকায় সিরিয়াল রেপিস্ট হিসেবে পরিচিত; পরবর্তীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। কিন্তু বিচার পেল না শিশুটির পরিবার।
২০২৫ সালে চট্টগ্রামের এক নারী রেলওয়ে কর্মী ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছিলেন। কিন্তু বিচার তো পানইনি, উল্টো মামলা করার পর থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন। শেষে কর্মস্থলে অনুপস্থিত দেখিয়ে তাকে কার্যত বরখাস্ত করা হয়।
তিনি বলেছেন, আমি ধর্ষণের বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করেছি। অভিযুক্ত চাকরিতে বহাল, আর আমি চাকরি হারিয়েছি। ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে তিনি দ্বিতীয়বার ভুক্তভোগী হলেন।
২০২৬ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের লালখানবাজার ট্যাংকির পাহাড়ের একটি বাসা থেকে ১২ বছরের শ্রাবন্তী ঘোষের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বাড়ির মালিক প্রদীপ লাল ঘোষ ও প্রতিবেশী অজয় সিংহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা এখনো তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে। পরিবারের সবচেয়ে বড় ভয়, ডিএনএ রিপোর্টের জন্য এবার কত বছর অপেক্ষা করতে হবে।
কেন বিচার হয় না
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী জানান, শিশু ধর্ষণের বিচার না হওয়ার প্রথম কারণ হচ্ছে সাক্ষী সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা না থাকা। ধার্য তারিখে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা নিশ্চিত করতে হাইকোর্ট বারবার নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেসব নির্দেশের কোনো প্রয়োগ নেই।
তিনি বলেন, সাক্ষী আনার আইনি দায়িত্ব পুলিশের; কিন্তু তারা সেটি পালন করে না। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে একটি মামলায় বারবার সমন পাঠানোর পরও পুলিশ সাক্ষীদের বিষয়ে আদালতকে কিছুই জানায়নি।
দ্বিতীয়ত, পরিবারের ওপর রয়েছে ভয়-ভীতি ও সামাজিক চাপ। আখতার কবির চৌধুরীর মতে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে, সাক্ষী সুরক্ষার অভাবে এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাদীপক্ষ আপস করতে বাধ্য হয়। আপস না করায় ভুক্তভোগী পরিবারকে সমাজচ্যুত করা, মসজিদে যেতে বাধা দেওয়া, হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তৃতীয় কারণ পুলিশি তদন্তের দুর্বলতা ও ডিএনএ সংকট। সারা দেশে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একমাত্র সিআইডির ল্যাব সচল। সেখানে প্রতিদিনের সক্ষমতা ২০টি নমুনা পরীক্ষার। কিন্তু প্রতিদিন আসছে ৩৩টিরও বেশি মামলা। ফলে ডিএনএ রিপোর্ট পেতে লাগছে এক থেকে চার বছর।
চতুর্থত রয়েছে প্রসিকিউশনের গাফিলতি। পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। মেডিকেল পরীক্ষায় দেরি হলে ধর্ষণ প্রমাণিত হয় না। আর্থিক লেনদেনের কারণেও তদন্ত থেমে যায়। এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণও নেই।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মৌমিতা পাল বলেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান অবনতি ঘটেছে, যা সার্বিকভাবে ধর্ষণসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
অপরাধবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, অপরাধ তখনই বাড়ে, যখন তিনটি উপাদান একসঙ্গে সক্রিয় হয় : সহজলভ্য ভিকটিম, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অপরাধীর দৃঢ় অপরাধপ্রবণতা। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে এ তিনটি উপাদানেরই একত্র উপস্থিতি লক্ষ করা যায় বলে তিনি মনে করেন।
এছাড়া সামাজিক কাঠামোর অবক্ষয়ের দিকটিও তুলে ধরে মৌমিতা বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ, পরিবারকেন্দ্রিক নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। সমাজে যখন যৌথ মূল্যবোধের পতন ঘটে আর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলো ঢিলেঢালা হয়ে যায়, তখন অপরাধীদের মনে ‘ধরা পড়লেও তেমন কিছু হবে না’এই মানসিকতা কাজ করে। আর এটিই অপরাধ বৃদ্ধির ‘মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি’ হিসেবে কাজ করে।
মৌমিতা পাল মনে করেন, শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে কেবল আইন কঠোর করলেই হবে না, এর যথাযথ বাস্তবায়নও জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


সীতাকুণ্ডে ট্রমা সেন্টারের অভাবে ঝরছে প্রাণ
লালমনিরহাট সীমান্তে ৩৩ জনকে পুশইনের চেষ্টা, কঠোর অবস্থানে বিজিবি