দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেলপথ প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও প্রকল্প সমাপ্তির জন্য জরুরি বেশ কিছু নথি এখনো জমা দেয়নি তদারকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্মেক বাংলাদেশ। এই ব্যর্থতার জেরে প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত নোটিস পাঠিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, যেখানে নির্ধারিত সময়ে কাজ না হলে অর্থ প্রদান স্থগিত এবং চুক্তি বাতিলের ধারা প্রয়োগেরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ১৩ মে প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে এই নোটিসটি পাঠানো হলেও সংগত কারণে এটি গোপন রেখেছিল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে আমার দেশ-এর হাতে এসেছে ওই চিঠির কপি। চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার রেল প্রকল্পের পরিচালক মো. আসাদুল হক।
জারি করা এই নোটিসে বলা হয়েছে, এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারিও একই বিষয়ে স্মেককে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বারবার তাগাদা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো পারফরম্যান্স সার্টিফিকেট, চূড়ান্ত বিল, প্রকল্প ও চুক্তি সমাপনী প্রতিবেদন, রেললাইনের প্রকৃত অবস্থান দেখানো ‘অ্যাজ-বিল্ট’ নকশা এবং হস্তান্তর-সংক্রান্ত কাগজপত্র জমা দেয়নি বলে জানিয়েছে রেলওয়ে।
নোটিস অনুযায়ী, ঠিকাদারের রেললাইনের চূড়ান্ত অবস্থান যাচাই ও হস্তান্তর নিশ্চিত করা, প্রকল্প সমাপনী প্রতিবেদন তৈরি, কাজের পরিমাণ যাচাই এবং অন্তর্বর্তীকালীন বিল মূল্যায়নের মতো দায়িত্বগুলো ছিল তদারকি পরামর্শক হিসেবে স্মেকেরই। এসব কাজ ঠিকমতো না হওয়ায় প্রকল্প বন্ধের প্রক্রিয়া, নিরীক্ষা, চূড়ান্ত অর্থছাড় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমÑসবকিছুই আটকে আছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট ভাষায় এটিকে চুক্তিগত দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থতার ‘চূড়ান্ত নোটিস’ আখ্যা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, সময়মতো নথি জমা না পড়লে চুক্তির প্রচলিত শর্ত অনুযায়ী বিল স্থগিতসহ অন্যান্য ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে চুক্তি বাতিলের পথেও হাঁটতে পারে তারা।
রেলওয়ে সূত্রের ভাষ্য, স্মেক যেসব প্রকল্পে তদারকি পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিল, তার প্রায় প্রতিটিতেই কাজের পরিধি বাড়ানো দেখিয়ে (ভেরিয়েশন) খরচ বহুবার বেড়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার ছাড়াও আখাউড়া-লাকসাম এবং যমুনা রেল সেতু প্রকল্পেও এই একই ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র দেখা গেছে।
পরামর্শকের ভূমিকা ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়
চুক্তি বাতিলের এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এলো, যখন স্মেকের কাজের ধরন নিয়ে রেলের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঠিকাদারকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের এমন বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র রেল কর্মকর্তাদের হাতে নেই। ফলে সেসব কাজ আদৌ সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে।
এই সংশয়ের একটি বড় কারণ প্রতিষ্ঠানটির জনবল কাঠামো। দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মো. মফিজুর রহমান ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পের নেতৃত্বে ছিলেন; তার আগে দুই বছর ছিলেন অতিরিক্ত পরিচালক। অবসরের পরপরই তিনি যোগ দেন স্মেক বাংলাদেশেÑসেই প্রতিষ্ঠানেই, যার কাজ তিনি এক সময় নিজেই তদারকি করতেন। রেলের কর্মকর্তারা একে স্বার্থের সংঘাত বলে মনে করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মফিজুর রহমান একা নন। আবু জাফর, এএমএন খসরু, আনহার মাহমুদ, সালেহ আহমেদ, শম্ভু মিত্র বড়ুয়া, আনিসুর রহমানসহ রেলের একাধিক সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবসরের পর যোগ দিয়েছেন স্মেকে। রেলওয়ের নথি বলছে, গত দুই দশকে রেলের যত পরামর্শক নিয়োগ হয়েছে, তার ৮০ শতাংশ কাজই পেয়েছে এই একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে রেল ও সেতু-সংশ্লিষ্ট ২২টি প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করা স্মেক গত এক দশকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ চার হাজার কোটি টাকারও বেশি অঙ্কের চুক্তি পেয়েছে।
বর্তমানে রেলের সাতটি চলমান পরামর্শক-সংক্রান্ত প্রকল্পের (মোট ব্যয় ৫৬৪ কোটি টাকা) মধ্যে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ও সিলেট-ছাতক বাজার রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে আছে স্মেক, আর চট্টগ্রাম-দোহাজারী সম্প্রসারণ ও গ্রিন রেলওয়ে প্রকল্পে নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। রেলের সবচেয়ে ব্যয়বহুল তিন প্রকল্পÑপদ্মা রেল লিংক, দোহাজারী-কক্সবাজার এবং যমুনা রেল সেতু, যেগুলোর সম্মিলিত ব্যয় এক লাখ কোটি টাকার বেশিÑসেখানেও তদারকি পরামর্শক এই স্মেকই।
অলাভজনক প্রকল্পেও ‘লাভজনক’ সনদ
সমালোচনা রয়েছে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজেও। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া পাবনা-ঢালারচর রেলপথ প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও এখন সেখানে চলে মাত্র একটি ট্রেন, যাত্রীও নেই বললেই চলে। অথচ যাত্রী পরিবহনে লাভজনক হবে বলে সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন দিয়েছিল স্মেক। একইভাবে ফরিদপুর-গোপালগঞ্জ ও গোপালগঞ্জ-মাগুরা রুটেও রেলের নিজস্ব কর্মকর্তারা যাত্রী-চাহিদা না থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় প্রকল্প দুটি নেওয়া হয়, আর স্মেক সেগুলোকে লাভজনক আখ্যা দেয়Ñযার সম্মিলিত ব্যয় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। ভারতীয় ঋণে নির্মিত খুলনা-মোংলা রেলপথেও একই ধরনের সনদ দেয় স্মেক, যদিও প্রকল্প ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং এখনো চলে মাত্র একটি ট্রেন।
স্মেকের সঙ্গে অনেক প্রকল্পে যৌথভাবে কাজ করা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টেও (ডিডিসি) দেখা মেলে রেলের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাবেক মহাপরিচালক কামরুল আহসান মফিজুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে পরিচিত। কামরুল আহসান যখন রেলের মহাপরিচালক, তখন মফিজুর রহমান ছিলেন দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পের পরিচালক। এখন চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথের তদারকিতে যৌথভাবে কাজ পেতে যাচ্ছে স্মেক ও ডিডিসি অর্থাৎ চাকরিতে থাকা অবস্থায় যারা এই প্রতিষ্ঠান দুটিকে সহযোগিতা করেছেন, অবসরের পর তারাই আবার একসঙ্গে রেলের কাজ পাচ্ছেন। ডিডিসিতে আরো আছেন রেলের সাবেক কর্মকর্তা তাফাজ্জল হোসেন, নুরুল আমিন ও মোজাম্মেল হকসহ কয়েকজন।
স্মেকের দায়িত্ব গ্রহণ সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে মফিজুর রহমান জানান, তিনি স্মেকের দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময় রেলের চাকরিতে থাকা অবস্থায় যেসব প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি ছিল, অবসরের পর সেই প্রতিষ্ঠানেই চাকরি নেওয়াকে সঠিক মনে করেন কিনাÑএমন প্রশ্ন করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আর কল রিসিভ করেননি।
স্মেকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাসুদুর রহমানকে সাতদিন ধরে ফোন করা হলেও পাওয়া যায়নি। পরে প্রশ্ন আকারে তার হোয়াটসঅ্যাপ ও সরাসরি নম্বরে পাঠানো হলে কোনো উত্তর দেননি। পরে এক পর্যায়ে এই প্রতিবেদককে ব্লক করে দেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

