খাতা-কলমে শিক্ষার্থী ১৩০, বাস্তবে নেই

কাউনিয়ায় ‘কাগুজে বিদ্যালয়’ নিয়ে তোলপাড়

কাউনিয়ায় ‘কাগুজে বিদ্যালয়’ নিয়ে তোলপাড়
ছবি: আমার দেশ

একটি সাইনবোর্ড আছে, টিনের একটি ঘর আছে, সরকারি কাগজপত্রে রয়েছে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের হিসাব। কিন্তু বাস্তবে কোথায় সেই বিদ্যালয়? এমন প্রশ্ন উঠেছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ ইউনিয়নের সাব্দী গ্রামের ‘শহীদবাগ বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’ ঘিরে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার দাবি করা এই বিদ্যালয়ে ১৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রয়েছেন একাধিক শিক্ষকও। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থী-শিক্ষকের উপস্থিতি, পাঠদান কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা কার্যক্রমের দৃশ্যমান চিত্র পাওয়া যায়নি।

সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর। বাইরে রয়েছে বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষা উপকরণ, প্রশিক্ষণসামগ্রী কিংবা নিয়মিত পাঠদানের দৃশ্যমান পরিবেশ চোখে পড়েনি। বিদ্যালয়ে ১৩০ জন শিক্ষার্থী থাকার দাবি করা হলেও সরেজমিনে উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠদানের পরিবেশও চোখে পড়েনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয়—এমন দৃশ্য তারা কখনো দেখেননি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতিও তাদের চোখে পড়ে না। তাদের দাবি, কাগজপত্রে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল দেখানো হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

এদিকে বিদ্যালয়টি সরকারি স্বীকৃতি, এমপিওভুক্তি কিংবা অনুদানের আওতায় আসবে—এমন আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগের নামে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেফালি খাতুন ও তার স্বামী প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুল হাই। তবে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিদ্যালয়টি নিয়ে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনিক পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পাল বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসবেন—এমন খবর পাওয়ার পর আশপাশের এলাকা থেকে সাধারণ শিশুদের এনে শ্রেণিকক্ষে বসানো হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সময় প্রকৃত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল না। পরিদর্শন শেষ হওয়ার পর বাইরে থেকে আনা ওই শিশুদের আর বিদ্যালয়ে দেখা যায়নি বলেও দাবি করেন তারা। ফলে প্রশাসনিক পরিদর্শনকে সামনে রেখে বিদ্যালয়ে কৃত্রিমভাবে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে প্রধান শিক্ষক শেফালি খাতুনের স্বামী আব্দুল হাইয়ের নাম থাকায় বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বামী-স্ত্রীর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়ের পরিচালনা ও নিয়োগ কার্যক্রমে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কোনো নথি বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম যদি কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার অধিকার এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার প্রশ্নও জড়িত।

তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেফালি খাতুন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বিশেষ শিশুদের নিয়ে কাজ করা কঠিন হলেও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার স্বামী সভাপতি থাকার বিষয়টিও সবার সম্মতিতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে পরিদর্শনের দিন বাইরে থেকে শিশু এনে শ্রেণিকক্ষে বসানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা আনছার আলী বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পরিদর্শনের বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পাল বলেন, পরিদর্শনকালে বিদ্যালয়ের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। অন্য স্থান থেকে শিশু এনে পরিদর্শকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা চরম অন্যায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের নামে কোনো ধরনের অনিয়ম, ভুয়া শিক্ষার্থী প্রদর্শন কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা, প্রকৃত শিক্ষার্থী-শিক্ষকের সংখ্যা, নিয়মিত পাঠদান, পরিচালনা কমিটি, নিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থ লেনদেন এবং সরকারি স্বীকৃতি বা অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—সবকিছু নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হোক। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তার দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত কার্যক্রম নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন