বিশ্বজুড়ে আলোচিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের কয়েক মিলিয়ন পৃষ্ঠার নথির মধ্যে উঠে আসে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ফেনী-৩ (দাগনভূঞা–সোনাগাজী) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নাম। এ নিয়ে ফের আলোচনায় আবদুল আউয়াল মিন্টু। এসব নথিতে এপস্টেইনের রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থায়ন কাঠামো এবং প্রভাববলয়ের বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়।
নথিগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসনের নির্বাচনী প্রচারণার অর্থায়ন সংক্রান্ত। এতে দেখা যায়, জেফরি এপস্টেইন নিজে ওই প্রচারণার অন্যতম শীর্ষ দাতা ছিলেন এবং তিনি সেখানে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দেন।
এই একই প্রচারণায় দাতাদের তালিকায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নামও রয়েছে। নথি অনুযায়ী, তিনি বিল রিচার্ডসনের নির্বাচনি তহবিলে ৫ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান দেন। তালিকায় তাকে ‘বাংলাদেশের ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এপস্টেইন ও মিন্টু-উভয়েই একই রাজনৈতিক নেতার প্রচারণায় অর্থ প্রদান করায় তাদের নাম একই নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ (দাগনভূঞা–সোনাগাজী) আসনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার আলাইয়াপুর গ্রামের হাজী সফি উল্যাহর বড় সন্তান।
তার পিতা প্রয়াত হাজী সফি উল্যাহ উপজেলার রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং পরবর্তীতে দাগনভূঞা উপজেলার প্রথম দুই মেয়াদে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পারিবারিকভাবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ও স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত।
মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত বিপুল নথি প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, জেফরি এপস্টেইনের শিশু পাচার চক্রের সঙ্গে মার্কিন রাজনীতিবিদ বিল রিচার্ডসনের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এদিকে রিচার্ডসনের নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে ৫০০০ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন আব্দুল আওয়াল মিন্টু।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অভ জাস্টিসের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৬ সালে রিচার্ডসন দ্বিতীয় মেয়াদে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে অংশ নিয়ে গভর্নর নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে অনুদান দাতাদের
একটি তালিকা পাওয়া যায় EFTA02729080 শীর্ষক ফাইলে।
৭ মার্চ ২০০৬ সালে তৈরি করা উক্ত ফাইলের ২৬ নং পৃষ্ঠায় দেখা যায়, বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর কাছ থেকে ৫ হাজার ডলার অনুদান পেয়েছিলেন রিচার্ডসন। একই ক্যাম্পেইনের জন্য জেফরি এপস্টেইন তাকে অনুদান হিসেবে দিয়েছিল ৫০ হাজার ডলার। অবশ্য জেফরি এপস্টেইনের সাথে আব্দুল আওয়াল মিন্টুর কোনো সরাসরি যোগাযোগের তথ্য এতে পাওয়া যায়নি।
কে এই রিচার্ডসন?
উইলিয়াম ব্লেইন রিচার্ডসন (১৫ নভেম্বর ১৯৪৭ -১ সেপ্টেম্বর ২০২৩) ছিলেন একজন মার্কিন রাজনীতিবিদ, লেখক ও কূটনীতিক। তিনি ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের ৩০তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ক্লিনটন প্রশাসনে তিনি জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং জ্বালানি বিষয়ক সচিব ছিলেন। এছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য, ২০০৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনের চেয়ারম্যান এবং ডেমোক্র্যাটিক গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশন (ডিজিএ)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জেফরি এপস্টিনের সাথে যোগাযোগ
ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ও জেফ্রি এপস্টিনের সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে হওয়া একটি দেওয়ানি মামলার আদালত নথিতে উইলিয়াম ব্লেইন রিচার্ডসনের নাম উল্লেখ ছিল। নথিগুলো ৯ আগস্ট ২০১৯ সালে এপস্টিনের মৃত্যুর ঠিক এক দিন আগে প্রকাশ করা হয়। জিউফ্রে অভিযোগ করেন, ২০০০-এর দশকের শুরুতে তিনি নাবালক থাকাকালীন এপস্টিন ও ম্যাক্সওয়েল তাকে রিচার্ডসনসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে যৌন মিলনের জন্য পাঠিয়েছিলেন।
জেফরি এপস্টিন ২০০২ সালে নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে রিচার্ডসনের প্রচারণায় ৫০ হাজার ডলার অনুদান দেন এবং ২০০৬ সালে তার দ্বিতীয় নির্বাচনের প্রচারণাতেও একই অঙ্কের অর্থ দেন। পরে ২০২৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস প্রকাশিত এপস্টিনের হেলিকপ্টার ফ্লাইট লগে দেখা যায়, ২০১১ সালে রিচার্ডসন ও তার চিফ অব স্টাফ ব্রায়ান কন্ডি এপস্টিন এবং তার তিনজন ভিক্টিমের সঙ্গে ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ করেছিলেন।
শিশু-পাচার চক্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ:২০১৯ সালে প্রকাশিত হওয়া নথিতে এপস্টিনের শিশু পাচার চক্রের সঙ্গে রিচার্ডসনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তবে রিচার্ডসন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার মুখপাত্রও জানান, রিচার্ডসন জিউফ্রেকে চিনতেন না এবং এপস্টিনকে কখনোই নাবালক মেয়েদের সঙ্গে দেখেননি।
২০১৯ সালের আগস্টে রিচার্ডসন বলেন, এপস্টিনের মামলায় তিনি নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের মার্কিন অ্যাটর্নিকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে তার আইনজীবী জানান, সংশ্লিষ্ট সহকারী মার্কিন অ্যাটর্নির কাছ থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে তার বিরুদ্ধে সরকার সক্রিয়ভাবে কোনো অভিযোগ তদন্ত করছিল না।
এদিকে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মৃত্যুবরণ করা ভার্জিনিয়া জিউফ্রে তার মৃত্যোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথা Nobody's Girl: A Memoir of Surviving Abuse and Fighting for Justice (অক্টোবর ২০২৫)-এ আবারও দাবি করেন যে তাকে রিচার্ডসনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয়েছিল। একই বছরের ১২ নভেম্বর প্রকাশিত নথিতে নিশ্চিত করা হয় যে এপস্টিনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ তালিকায় থাকা বহু নামের মধ্যে রিচার্ডসনের নামও ছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

