ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় চরম বিপর্যয় ঘটেছে। বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং জিনোদপুর ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, নন-এমপিও শিক্ষক দিয়ে কোনোমতে পাঠদান চালানো এবং মানসম্মত ও নিয়মিত শিক্ষার্থী না পাওয়াই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৩৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা দেন মাত্র সাতজন (সকলেই ছাত্রী)। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তাদের কেউই পাস করতে পারেনি। গত বছর এই প্রতিষ্ঠান থেকে সাতজন পরীক্ষা দিয়ে চারজন পাস করেছিল।
অন্যদিকে, জিনোদপুর ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন চারজন, যার মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র দুজন। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, দুজনই ফেল করেছেন যার মধ্যে একজন চার বিষয়ে এবং অন্যজন এক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। বিগত বছরেও এই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনজন পরীক্ষা দিয়ে সবাই ফেল করেছিলেন।
উপজেলার অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের চিত্রও বেশ হতাশাজনক। থোল্লাকান্দি গ্রামে অবস্থিত রাবেয়া মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে দুজন পরীক্ষা দিয়ে মাত্র একজন পাস করেছে। এছাড়া কৃষ্ণনগর আব্দুল জব্বার কলেজ থেকে গত বছর ফল বিপর্যয়ের পর এ বছর কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দৈন্যদশার পেছনে অভ্যন্তরীণ নানা সংকট উঠে এসেছে। বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন জানান, মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো কলেজ চালানো হচ্ছে, যাদের উভয়েই নন-এমপিওভুক্ত। অদ্ভুত বিষয় হলো, কলেজে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী থাকলেও কর্মরত দুজন শিক্ষকই বাণিজ্য বিভাগের। বাংলা, ইংরেজি ও আইসিটির মতো মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহ অধিকাংশ বিষয়েরই কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই। বাধ্য হয়ে স্থানীয় হাইস্কুলের শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস চালিয়ে পাঠদান সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এত শিক্ষক-সংকটের মধ্য দিয়ে এভাবে একটি কলেজ চলতে পারে না, এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা গভীরভাবে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন।
বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ইউসুফ খান সুহেল জানান, এলাকার তুলনামূলক দুর্বল ও কম মেধাবী শিক্ষার্থীরাই সাধারণত এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। অতীতে ফলাফল কিছুটা সন্তোষজনক হলেও এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ নিয়েছে।
জিনোদপুর ইউনিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ গোলাম সাদেক আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ মানসম্মত শিক্ষার্থী না পাওয়া। যারা ভর্তি হয়, তারা নিয়মিত ক্লাসে আসে না; কেবল ফরম পূরণ করে পরীক্ষা দিতে আসে। এভাবে কত দিন চলবে বুঝতে পারছি না, বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে।
এ বিষয়ে নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাকিবুল ইসলাম বলেন, দুটি প্রতিষ্ঠানের ফল বিপর্যয়ের বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শোকজ করা হবে। মাত্র দুই-চারজন শিক্ষার্থী নিয়ে কলেজ পরিচালনা ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব বিষয়ে শিক্ষক নেই, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম এবং এ বছর যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

